পাশ্চাত্য ইসলাম বিরোধী ষড়যন্ত্র (২য় পর্ব) – শায়খ আব্দুল্লাহ আযযাম (রহঃ)

সাজানো অপবাদ

আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হয়ে গেছে এবং আমাদের চতুষ্পার্শ্বে তা আমরা অনুভব করছি। প্রত্যেক দিন আমাদের বিরুদ্ধে নতুন নতুন ষড়যন্ত্র পাকানো হচ্ছে। আমাদের দোষ বের করার জন্য পাকিস্থানের গোয়েন্দা সংস্থার প্রতি তাদের প্রবল চাপ জিয়াউল হকই (রহঃ) বন্ধ করেছেন এবং গোয়েন্দাদের কালো হাত আমাদের উপর থেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। নতুবা করাচিতে মার্কিন বোয়িং বিমান বিস্ফোরণের জন্য আমাদেরকেই দায়ী করা হত। তারা পাকিস্থানের একজন সরকারী ব্যক্তিকে অবহিত করল যে, আপনাদের আব্দুল্লাহ আযযামই বোয়িং বিমান বিস্ফোরণের পরিকল্পনা আঁটে এবং বিশজন পাকিস্থানীকে হত্যা করে। তিনি নির্দ্বিধায় সাথে সাথে তার প্রতিবাদ করে বললেন, ‘এ ছাড়া আব্দুল্লাহ আযযামের বিরুদ্ধে অন্য কোন অপবাদ রটাতে পার কি না দেখ। এ হচ্ছে নাস্তিক সমাজতন্ত্রীদের কাজ, যারা পত্রিকায় রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের সংবাদ উঠানোর জন্য মুসলমানকে হত্যা করে তাদের ঘাড়ে দোষ চাপানোর অপচেষ্টা করে’। আরো অনেক ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে, যার সামান্য কিছুই আমরা টের পাচ্ছি। এসব আমাদের বিরুদ্ধে অবিরাম চলছে। আমাদের বিরুদ্ধে হাঙ্গামা সৃষ্টির পাঁয়তারাকারী বিভিন্ন গুপ্তচরের গতিবিধি থেকে আমি আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের স্পষ্ট চিত্র দেখতে পাচ্ছি। মানুষ তার পথ চলায় ভুল করা স্বাভাবিক। যে কাজ করে তারই পদস্খলন হয়। যে বসে রয়েছে, তার পদস্খলন হবে কীভাবে? যিনি ময়দানে কাজ করছেন, পদস্খলন তাঁরই হয়। তার প্রচেষ্টা ও দ্রুততা যত বৃদ্ধি পাবে, তার পদস্খলনও তত বেশী হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওসীয়ত করেছেন-

“তোমরা ভাল লোকদের পদস্খলনকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখ। আল্লাহর কসম! তাদের কারো পদস্খলন হয়, অথচ আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়াতাআলা নিজ হাত দিয়ে তার হাত ধরে আছেন”।

জিহাদের রূপ আজ পরিবর্তন হয়ে গেছে। তাই আজ আফগানিস্থানে গিয়ে জিহাদ করার পরিবর্তে ইখওয়ানুল মুসলিমীন, সালাফিইয়ীন, জ্বিহাদ গ্রুপ ইত্যাদি নিয়ে দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে গেছে। পেশোয়ারে এ নিয়ে ধুম পড়ে গেল। আমি এদের প্রত্যেককে চিনি না এবং তাদের যাদেরকে এ নিয়ে ব্যস্ত হতে দেখেছি তাদের ব্যাপারে প্রত্যেককে অবহিতও করতে পারব না।

অনেক দূতাবাসের কাজই হচ্ছে আমার বিরুদ্ধে অপবাদ প্রচার করা। আমি নাকি টাকা-পয়সা নিয়ে পেশোয়ার থেকে চলে গেছি। আমি রমযানে যখন উমরা করতে গেলাম, তখন অনেক ভাল লোক পর্যন্ত মিথ্যুকের ফাঁদে পড়ে বলেছে যে, তিনি তার পরিবার নিয়ে সৌদি আরবে চলে গেছেন এবং মুজাহিদদের জন্য জমাকৃত সকল টাকা-পয়সা নিয়ে গেছেন, যাতে করে সেখানে অনায়াসে জীবন যাপন করতে পারেন।

আল্লাহর কসম! আমি কিছু দেশে আমার বিরুদ্ধে ক্যাসেট পর্যন্ত প্রচার করতে দেখেছি। আমার অপরাধ সমূহ তুলে ধরে সেগুলো বিশেষ ব্যক্তিবর্গকে শোনানো হয়। আর সাধারণ লোকদের শোনানোর জন্যেও কিছু ক্যাসেট তারা তৈরী করেছে। কিন্তু আমরা এখনো এ পথে আছি। কারা এসব করছে, তা আমাদের জানা আছে। কিন্তু হৃদয়ে আঘাত তখনই লাগে যখন আল্লাহর পথে বের হওয়া কিছু সৎ লোকের মুখ থেকে এসব কথাবার্তা শুনি। তারা মুখ দিয়ে নিজেদের অজান্তেই নিজেরদের কর্মের প্রতিদান নষ্ট করছে। এ বোধশক্তি তাদের মধ্যে সৃষ্টি হচ্ছে না যে, যাদেরকে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়াতাআলা জিহাদের ঝান্ডা বহনের জন্য নির্বাচিত করেছেন, তারাই সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। তাই তাদের অনেককে দেখা যায় জিহাদের ময়দানে এসে শুধু এক মাস বা দু’মাস নয় বরং বছরের পর বছর পর্যন্ত কাটিয়েও আবার পূর্বাবস্থায় ফিরে যায়। এ থেকে নিজেদের কীভাবে রক্ষা করতে হয়, তা তারা জানে না।

তুরস্কে ইসলামি সাম্রাজ্যের পতনের পর যে সশন্ত্র জ্বিহাদ ও ইসলামী আন্দোলন পৃথিবীর বুকে দেখে দেয়, তা হচ্ছে আফগানিস্থানের এ জমায়েত যাকে গোটা পৃথিবী ভয় করছে । আমি জানি যে, আমেরিকান ও ইয়াহুদীরা আমাদের এ জমায়েতকে যে কোন পন্থায় টুকরো টুকরো করে দিতে সদা তৎপর। ইয়াহুদীরা জেনেভা সম্মেলনে দাবী করেছে পাকিস্থানের সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো বন্ধ করে দিতে, যাতে আরব ও অন্যান্য মুসলমানগণ যারা জিহাদের ফরয আদায় করতে এসেছে, তাদের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়।

১৯২৪ এরপর বিশ্ব মুসলমানের রক্তমাখা প্রথম জ্বিহাদ এটাই। মালয়েশিয়ান, মিশরী, সৌদী, ফিলিস্থিনী ও জর্ডানিসহ সবার রক্তে রঞ্জিত এ জ্বিহাদ। তাই তারা ভেবে কুল পাচ্ছে না, কোন বস্তু এদেরকে এই ঐক্যবদ্ধ প্লাটফরমে নিয়ে এলো? কোন অক্ষে তারা সবাই ঘুরছে? তাই তারা ভাবছে, যদি এদের মধ্যে বিরোধ ঢুকিয়ে দেয়া যায়, তাহলে ভবিষ্যতে যুবকদের এ কাফেলা আর মাথা তুলে দাড়াতে পারবে না। ইখওয়ানুল মুসলিমীন, সালাফী দল ও জ্বিহাদ গ্রুপ প্রভৃতির বিরোধ যা এখন শোনা যাচ্ছে, আল্লাহ সাক্ষী আছেন, এখানে আসার পর থেকে এ পর্যন্ত এসবের কোন চিন্তা আমাদের অন্তরে কখনও জাগ্রত হয়নি। অতএব, আপনাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীদের ব্যাপারে সতর্ক হোন, এসব থেকে দূরে থাকুন, যা আপনাদেরকে খেলনার লাঠিম বানাতে চায়, আপনাদের সৎকর্মের প্রতিদান নষ্ট করতে চায় এবং এ বরকতময় জমায়েতের সুফল ধ্বংস করতে চায়। এ জমায়েত নিয়ে আমাদের অনেক আশা-আকাঙ্ক্ষা রয়েছে।

ভাল; তুমি জিহাদের দায়িত্ব পালন করতে এসেছ, মজলুমানদের পাশে দাড়াতে এসেছ। হতে পারে আল্লাহ্ তোমাকে ইসলামের বিজয়ও দেখাতে পারেন। অনুরূপ তোমাকে অন্য রণাঙ্গনেও উপস্থিত হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম ভূখন্ডগুলোর কাফের বা ফাসিকের দখলদারিত্ব চলছে, সেগুলো মুক্তির জন্য তোমার অপেক্ষা করছে। ফিলিস্তিন আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে, দক্ষিণ ইয়ামান আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে, ফিলিপাইন আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। এভাবে ইরিত্রিয়া, সোমালিয়া ও রুমানিয়াসহ মুসলিম বিশ্বের অনেক ভূখন্ড পাশবিক জুলুম থেকে মুক্তির জন্য আমাদের পানে চেয়ে আছে। আমাদের রণাঙ্গন শুধু আফগানিস্থান নয়। যদি আপনারা রণাঙ্গনের বিশালতা ও রণাঙ্গনে ইসলামের শত্রুদের ষড়যন্ত্রের কুট- কৌশল উপলব্ধি করতে সক্ষম না হন, তাহলে আপনারা নিজেদের কর্মের প্রতিদানের প্রতি মনোনিবেশ করুন এবং নিজেদের যবানকে সংযত রাখুন। হয়তো আল্লাহ্ আপনাদের কর্মগুলোকে গ্রহণ করবেন এবং আপনাদেরকে তার জান্নাতে স্থান দিবেন।

ইসলামকে ধ্বংস করার এখন সহজ পদ্ধতি হচ্ছে ইসলামী আন্দোলনের মাঝে বিরোধ ঢুকিয়ে দিয়ে একের বিরুদ্ধে অপরকে নিয়োজিত করা। তারা উপলব্ধি করেছে যে, আমরা যদি তাদের একের বিরুদ্ধে অপরকে ব্যস্ত না রাখি, তাহলে তারা আমাদের নির্মূলে সর্বশক্তি নিয়োগ করবে। কী করতে হবে তা শত্রুরা ভাল করে জানে, কিন্তু আপনাদের অনেকেই জানে না।

আল্লাহ্ সে ব্যাক্তির প্রতি রহম করুন, যে তার দায়িত্ব চিনে তা পালনে ব্যস্ত হয়ে গেছে। নিজের উদ্দেশ্য ঠিক করুন। আপনি কেন এসেছেন ও কোথায় গিয়ে আপনার দায়িত্ব শেষ হবে, তা নিয়ে ভাবুন। কী আশ্চর্য! তুমি এমন বিষয় গুলো নিয়ে কেন ব্যস্ত, যা আখিরাত তোমার কর্মের প্রতিদান নষ্ট করবে?

আমরা আগেও বলেছি, এখনো বলছি, ইনশা আল্লাহ্ আমাদের এ পথে দৃঢ়পদ রাখবেন। মুসলিম বিশ্বের প্রসিদ্ধ কোন কোন ব্যক্তি এসে আমার কাছে বিভিন্ন প্রস্তাব পেশ করেন এবং দাবী করেন যে তিনি আমার কল্যাণ কামনা করেন ও আমাকে ভালবাসেন। বললেন, আমার ভয় হচ্ছে আপনার বিরুদ্ধে বড় ধরণের ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। তাই আমি আপনার কল্যাণার্থে বলছি যে আপনি আফগানিস্থান থেকে বাইরে চলে যান। বাস্তবেই তিনি আমার কল্যাণকামী। তাই আমি তাঁকে বললাম, তিন অবস্থা ছাড়া অন্য কোন অবস্থায় আমি আফগানিস্থান ত্যাগ করব না। হয়তো পেশোয়ারে নিহত হবো নতুবা আফগানিস্থানে নিহত হবো কিংবা পাকিস্থান আমাকে জোর করে বের করে দিবে। এ ছাড়া আমি এ ভূমি ছেড়ে কোথাও যাব না, যাতে আফগানিস্থানের জিহাদের ফলাফল দেখে আমার চক্ষু শীতল হয়।

গোয়েন্দাগিরি, হানাদারদের আক্রমণের তৎপরতা ইত্যাদি সবকিছু আমাদের বিরুদ্ধে দৈনন্দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমার আশে পাশের লোকেরা ওসীয়ত করছে বেনজিন ও ১৮০ তথা সর্বশেষ মডেলের গাড়ী ব্যবহারের জন্য। কারণ, জিহাদের প্রতি তিরস্কার বেড়ে গেছে।

আল্লাহ্ বলেছেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا مَن يَرْتَدَّ مِنكُمْ عَن دِينِهِ فَسَوْفَ يَأْتِي اللَّهُ بِقَوْمٍ يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ أَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى الْكَافِرِينَ يُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا يَخَافُونَ لَوْمَةَ لَائِمٍ ۚ ذَٰلِكَ فَضْلُ اللَّهِ يُؤْتِيهِ مَن يَشَاءُ ۚ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ [٥:٥٤]

“হে মুমিনগণ! তোমাদের মধ্যে যারা স্বীয় দ্বীন থেকে দূরে সরে যাবে, তাদের পরিবর্তে আল্লাহ্ শীঘ্রই এমন একটি সম্প্রদায় নিয়ে আসবেন, যাদেরকে তিনি ভালবাসেন এবং তারাও তাঁকে ভালবাসবে। তারা মু’মিনদের প্রতি (নিজেরদের পরস্পরে) সহানুভূতিপরায়ণ ও কাফিরদের প্রতি কঠোর হবে এবং আল্লাহর পথে জ্বিহাদ করবে। আর এ ব্যাপারে কোন তিরস্কারকারীর তিরস্কারকে ভয় করবে না। এটা আল্লাহর একান্ত অনুগ্রহ্ যা তিনি যাকে ইচ্ছা দান করেন থাকেন।”

[আল মায়েদাঃ ৫৪]

গালি ও তিরস্কার সাধারণত আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের পক্ষ থেকে করা হয়ে থাকে। কারণ, শত্রুরা তিরস্কার করে না; শত্রুতা করে। তাই জিহাদের জন্য এমন লোকেরাই প্রয়োজন, যিনি তার লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাসী। আমরা লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নির্ধারণ করেছি, আমরা চাচ্ছি একটি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে।

দুনিয়ার সকল প্রচার মাধ্যমই এই দ্বীনের প্রতি শত্রুতা পোষণ করে। যে সব প্রচার মাধ্যম নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য প্রকাশ্যে শত্রুতা ভাব দেখায় না, তারাও আমাদের বিরুদ্ধে যথাসম্ভব কৌশলে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে।

আল্লাহর কাছে কামনা করি, যতদিন আমরা জীবিত থাকি, যতদিন আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস বাকী থাকবে, ততদিন যেন তিনি আমাদেরকে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জিহাদের এ মহান পথে দৃঢ়পদ রাখেন। আল্লাহ্ না করুন, যদি আমরা এখান থেকে বিতাড়িত হই, তাহলে আমরা অন্য খানে চলে যাব। আমাদের কর্মক্ষেত্র কেবল আফগানিস্থান নয়, এখানে শুধু আমরা সাহায্য-সহযোগিতা দান করছি। আফগানিস্থানে আমাদের কাজ আল্লাহর দ্বীন আল্লাহর জমীনে প্রতিষ্ঠিত করা, যা তিনি সপ্তাকাশের উপর থেকে আমাদের জন্য ফরয করে দিয়েছেন।

আমাদের কাজ কেবল সেবা সংস্থার কাজ নয়। আর আমাদের কাজ রাজনৈতিক সমাধান পেশ করাও নয়। আমরা এমন এক বাহিনী, যাদেরকে রাব্বুল আলামীন এ দ্বীনের জন্য সৈনিকের দায়িত্ব পালণের নির্দেশ দিয়েছেন। দুনিয়ার যেখানেই হোক না কেন যারা আমাদের সাথে পথ চলতে চায়, তাঁদেরকে আমরা মাথায় তুলে নিতে প্রস্তুত। এ ক্ষেত্রে আমাদের জানা মতে যারা নিষ্ঠাবান, তাদের ভুল ভ্রান্তিগুলো আমরা সহ্য করে নিব। তবে যারা এ ধরণের নয়, তাদের যিম্মা আল্লাহর হাতে।

وَلَا يَحِيقُ الْمَكْرُ السَّيِّئُ إِلَّا بِأَهْلِهِ ۚ

“কুচক্রান্তের চূড়ান্ত স্বীকার কুচক্রীই”। [ফাতিরঃ৪৩]।

যে বিষয়টা নিয়ে আমাদের বেশী ভয় হচ্ছে তা হল নিষ্ঠা ও দৃঢ়তা। আল্লাহ্ আমাদের সবাইকে নিষ্ঠা ও দৃঢ়তার তাওফীক দান করুন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা যদি আমার উপর সন্তুষ্ট থাকেন, তাহলে দুনিয়ার কেউ আমাকে দুশ্চিন্তায় ফেলতে পারবে না। আমার দুশ্চিন্তা শুধু ইখলাস নিয়ে। ইখলাস ও দৃঢ়তা যদি বিদ্যমান থাকে, তাহলে আল্লাহ্ মুমিনদের সাহায্য করবেন, তাদের রক্ষা করবেন। তাই তিনি বলেছেন-

وَإِن تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا لَا يَضُرُّكُمْ كَيْدُهُمْ شَيْئًا ۗ إِنَّ اللَّهَ بِمَا يَعْمَلُونَ مُحِيطٌ [٣:١٢٠]

“আর তোমরা যদি ধৈর্য্য ধারণ কর ও আল্লাহকে ভয় করে চল, তাহলে তাদের ষড়যন্ত্র তোমাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না। নিঃসন্দেহে তারা যা করছে সে ব্যাপারে আল্লাহ্ অবহিত।”[আলে ইমরানঃ১২০]।

 

আফগানিস্থান নিয়ে ষড়যন্ত্র

আল্লাহু সুবহানাহু ওয়াতাআলা বলেন-

فَلَمَّا فَصَلَ طَالُوتُ بِالْجُنُودِ قَالَ إِنَّ اللَّهَ مُبْتَلِيكُم بِنَهَرٍ فَمَن شَرِبَ مِنْهُ فَلَيْسَ مِنِّي وَمَن لَّمْ يَطْعَمْهُ فَإِنَّهُ مِنِّي إِلَّا مَنِ اغْتَرَفَ غُرْفَةً بِيَدِهِ ۚ فَشَرِبُوا مِنْهُ إِلَّا قَلِيلًا مِّنْهُمْ ۚ فَلَمَّا جَاوَزَهُ هُوَ وَالَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ قَالُوا لَا طَاقَةَ لَنَا الْيَوْمَ بِجَالُوتَ وَجُنُودِهِ ۚ قَالَ الَّذِينَ يَظُنُّونَ أَنَّهُم مُّلَاقُو اللَّهِ كَم مِّن فِئَةٍ قَلِيلَةٍ غَلَبَتْ فِئَةً كَثِيرَةً بِإِذْنِ اللَّهِ ۗ وَاللَّهُ مَعَ الصَّابِرِينَ [٢:٢٤٩]

وَلَمَّا بَرَزُوا لِجَالُوتَ وَجُنُودِهِ قَالُوا رَبَّنَا أَفْرِغْ عَلَيْنَا صَبْرًا وَثَبِّتْ أَقْدَامَنَا وَانصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ [٢:٢٥٠]

فَهَزَمُوهُم بِإِذْنِ اللَّهِ وَقَتَلَ دَاوُودُ جَالُوتَ وَآتَاهُ اللَّهُ الْمُلْكَ وَالْحِكْمَةَ وَعَلَّمَهُ مِمَّا يَشَاءُ ۗ وَلَوْلَا دَفْعُ اللَّهِ النَّاسَ بَعْضَهُم بِبَعْضٍ لَّفَسَدَتِ الْأَرْضُ وَلَٰكِنَّ اللَّهَ ذُو فَضْلٍ عَلَى الْعَالَمِينَ [٢:٢٥١]

“যখন তিনি (তালূত) ও তার সাথে থাকা ঈমান আনয়নকারীরা তা (নদী) অতিক্রম করল, তখন তারা বলল, এখন জালূত ও তার সৈন্যের সাথে যুদ্ধ করার শক্তি আমাদের কাছে নেই। তবে যারা আল্লাহর সাক্ষাতের বিশ্বাস করত তারা বলল, আল্লাহর হুকুমে কত ছোট দল বড় দলের উপর বিজয় লাভ করেছে। আর আল্লাহ্ রয়েছেন ধৈর্য্যশীলদের সাথে। অতঃপর যখন তারা জালূত ও তার সৈন্যদের মোকাবিলায় মাঠে আসে, তখন বলল, ওহে আমাদের প্রভু! আমাদেরকে ধৈর্য্য দান করুন, আমাদেরকে দৃঢ়পদ রাখুন ও আমাদেরকে কাফিরের দলের উপর বিজয় দান করুন। ফলে তারা ওদেরকে (শত্রুদেরকে) পরাজিত করল এবং দাউদ জালূতকে হত্যা করল। আর আল্লাহ্ তাঁকে রাজ্য ও প্রজ্ঞা দান করলেন এবং তাঁকে যা চেয়েছেন, তা শিক্ষা দান করেছেন। আর আল্লাহ্ যদি মানুষের কতককে কতক দ্বারা দমন না করতেন, তাহলে নিশ্চয় পৃথিবী ধ্বংস হত । কিন্তু আল্লাহ্ বিশ্ববাসীর প্রতি দয়াপরায়ণ (ফলে তিনি তাদেরকে যুদ্ধের অনুমতি দেন)।”[বাকারাহঃ২৪৯-২৫১] ।

আল্লাহর রীতি ও নিয়ম আফগানিস্থানে শব্দের জগত থেকে কর্ম ও বাস্তবতার জগতে চলে এসেছে। ঈমানদারের ক্ষুদ্র একটি দল পৃথিবীর পরাশক্তির উপর বিজয় লাভ করেছে। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ তাগুত কম্যুনিজমের পরাজয় বিশ্বের হিসাব-নিকাশকে উলট-পালট করে দিয়েছে, আন্তর্জাতিক রাজনীতির সমীকরণকে ব্যর্থ করে দিয়েছে এবং বিশ্বের অপেক্ষমাণ সকল রাজনৈতিক অভিসন্দর্ভকে আশাহত করে গোটা দুনিয়াকে হতবাক করে দিয়েছে।

যে ক্ষুদ্র ঈমানদারের দলটিকে মাটির সাথে মিশে দেয়ার জন্য বিশ্ববাসী অবস্থান নিয়েছিল, তাকে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়াতাআলা তার করুণা ও দয়া দ্বারা সাহায্য করেছেন, দৃঢ়পদ রেখেছেন এবং

সে দলটি রক্তস্নাত ও কন্টকাকীর্ণ পথে কষ্ট সহ্য ও যন্ত্রণা হজম করে পনের বছর অবিরাম পথ চলেছে। এ পথে তাদের আলোকবর্তিকা শহীদের রক্ত। আল্লাহ্ এ ধরণের লোকদের ব্যাপারে বলেন-

فَمَا وَهَنُوا لِمَا أَصَابَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَمَا ضَعُفُوا وَمَا اسْتَكَانُوا ۗ وَاللَّهُ يُحِبُّ الصَّابِرِينَ [٣:١٤٦]

وَمَا كَانَ قَوْلَهُمْ إِلَّا أَن قَالُوا رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَإِسْرَافَنَا فِي أَمْرِنَا وَثَبِّتْ أَقْدَامَنَا وَانصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ [٣:١٤٧]

“কিন্তু তারা আল্লাহর পথে যে কষ্টের সম্মুখীন হয়েছিল, তার জন্য মনভাঙ্গা কিংবা দুর্বল হয়নি এবং নতি স্বীকারও করেনি। আর আল্লাহ্ ধৈর্য্যশীলদেরকে ভাল বাসেন। আর যুদ্ধের কঠিন মুহূর্তে তাদের কথা কেবল এই ছিল যে,হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের অপরাধ ও আমাদের কর্মে আমাদের বাড়াবাড়িকে ক্ষমা করুন এবং আমাদেরকে কাফিরের দলের উপর বিজয় দান করুন।”[আলে ইমরানঃ১৪৬,১৪৭] ।

সমাজ বিপ্লব, জাতি গঠন ও সম্মান পুনরোদ্ধারের যে পথ নির্দেশ আমাদেরকে আফগানিস্থান দান করেছে, তার মর্মকথা হচ্ছে এই যে, বিপ্লবের জন্য একটি শুদ্ধি আন্দোলন অপরিহার্য, যা কাজ শুরু করবে তাওহীদ দিয়ে। অতঃপর জাহিলিয়াত তার সর্বশক্তি নিয়ে এ তাওহীদের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করবে। শুরু হবে উভয়ের মধ্যে বাক ও প্রচার যুদ্ধ। মুমিনরা ধৈর্য্য ধারণ করবে। অতঃপর এমন দিন আসবে, মুমিনের দল অস্ত্র হাতে নেবে ও তরবারী কোশমুক্ত করবে এবং তাদের প্রভুর ইচ্ছায় বজ্রের ন্যায় পথ চলে উম্মাহর শক্তি ও কল্যাণকে বিস্ফোরিত করবে, জনসাধারণ তাদের পক্ষ নেবে এবং মানুষ ও লোহা ভক্ষণকারী এ জলন্ত চুলায় (রণাঙ্গনে) ত্যাগ দিতে থাকবে এবং সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে। এ যুদ্ধের প্রধান উপকরণ ইসলামী আন্দোলনের বীর সৈনিকেরা। মাঝপথে দুর্বল ও কাপুরুষেরা ঝরে পড়তে থাকবে এবং দৃঢ়পদেরা পথ চলা অব্যাহত রাখবে। দীর্ঘ সংগ্রামের পর লড়াইয়ের উত্তাপে আত্মাগুলো পরিশুদ্ধ হবে এবং হৃদয়গুলো পরিচ্ছন্ন ও চকচকে হবে। আল্লাহ্ তাঁদেরকে তার সম্মানের আচ্ছাদন বানাবেন, তাদের বিজয়ের ফলগুলোকে হেফাজত করবেন ও তাঁদেরকে তার দ্বীনের বিশ্বস্ত সংরক্ষক বানাবেন এবং তাঁদেরকে  পৃথিবীতে কর্তৃত্ব দান করবেন।

আফগান জিহাদের ইতিবৃত্ত

আফগান জিহাদের ইতিবৃত্ত হচ্ছে কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্ষুদ্র একদল ঈমানদার যুবকের ইতিবৃত্ত । যারা জহির শাহ্র তত্ত্বাবধানে পরিচালিত সমাজতান্ত্রিক অভিযানকে রুখে দাঁড়িয়েছিল। জহির শাহ্ তার পরামর্শ পরিষদের ছত্রিশজন কম্যুনিস্টকে কম্যুনিজম প্রচারের জন্য অনুমতি প্রদান করে। তখন কম্যুনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা তারাকী ‘খালক’ ও বারবক কারমাল ‘পরচম’ নামক পত্রিকা বের করে।

ইসলামী আন্দোলন তখন শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় পড়ে। অতঃপর যখন ইসলামী আন্দোলন কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করে, বিজয় লাভ করে তখন রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত এ বিজয়ের উপর মন্তব্য করতে গিয়ে বলল, এ দেশের ভবিষ্যৎ এ যুবকদের হাতে। অতএব, এদেরকে নির্মূল করার জন্য সামরিক প্রশাসনের বিকল্প নেই।

সামরিক প্রশাসন সংস্কার আন্দোলনের শিকড় উপড়ে ফেলা, নীতি-নৈতিকতাকে পদপিষ্ট করা ও অচলাবস্থা সৃষ্টি করে দেশ ধবংসকরণে সব সময়ই সিদ্ধ হস্ত থাকে। আর সামরিক শাসকের আগমণ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির মাধ্যমে এবং রাতের অন্ধকারেই ঘটে থাকে । জনসাধারণ তাঁকে করতালি দিয়ে স্বাগত জানালেও তার অভ্যুত্থানের নেপথ্য নায়করা প্রতি ক্ষণে ক্ষণে তাঁকে এ সতর্কতা দিয়ে থাকে যে, আমরা যে নিয়ম-রেখা তোমার সামনে এঁকে দিয়েছি, তা থেকে যদি চুল পরিমাণ সরে যাও, তাহলে শীঘ্রই তুমি গদিচ্যুত হবে। অতঃপর যখন দমন-নিপীড়ন ও নির্যাতন-নিষ্পেষণের ষ্টীম রোলার শুরু হয়ে যায়, তখন দেশ মেধা শূন্য হয়ে দেশে শুধু চরিত্র ধ্বংস করণে নিয়োজিত বিপ্লবীদের আধিপত্যই সর্বক্ষেত্রে বিরাজ করে।

সকল মুসলিম দেশে সামরিক প্রশাসনের চিত্র আমরা এরকমই দেখেছি। তবে এ দ্বারা এ কথা বলা উদ্দেশ্য নয় যে, অন্যান্য প্রশাসনগুলো ভাল। তবে অন্ধের চেয়ে কানা অবশ্যই উত্তম। এ একই সমস্যা আফগানিস্থানেও। ইসলামী আন্দোলনের সন্তানদের খতম করে দেয়ার জন্য জেনারেল দাউদকে ক্ষমতায় বসানো হয়। তার শাসনকে প্রতিরোধ করার জন্য ইসলামী আন্দোলনের সৈনিকেরা বন্দুকের সাহায্য গ্রহণের সিন্ধান্ত গ্রহণ করে। প্রথমে তাদের নিকট শুধু একটি পিস্তলই ছিল। সাইয়াফ তাঁদেরকে একত্রিত করে বলল, দাউদের স্বৈরশাসনের মুখে আমরা কী করতে পারি?তারা বল সশস্ত্র প্রতিরোধ। তবে আমাদের একটি শর্ত  এবং তা হচ্ছে একটি পিস্তলের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। সে থেকে লড়াই শুরু হল এবং আল্লাহর ইচ্ছায় তা অব্যাহত থাকে। তাদের সংগ্রাম খুবই কঠিন ছিল এবং তাদের ত্যাগ খুবই উন্নত ছিল।

কম্যুনিজম দেখতে পেল যে, দাউদ ইসলামী আন্দোলনকে খতম করতে সক্ষম হয়নি। ফলে সে তার নিয়ে আসা এ দাউদকে যবাই করে আরেকজনকে ক্ষমতায় বসাল। কারণ, কুকুর যখন পাহারদারিতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তখন তাঁকে হত্যা করে তার চেয়ে আরো শক্ত বিষদাঁত ও অধিক হিংস্রতা সম্পন্ন একটিকে নিয়ে আসা হয়। তাই দাউদকে হত্যা করে তারাকীকে নিয়ে আসা হয়। তারাকী প্রকাশ্য কাফির ছিল এবং কমুউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ছিল। তখন বিজ্ঞ আলেমরা ফতওয়া দিলেন যে, তারাফী কাফির ও এর বিরুদ্ধে লড়াই করা ফরয। ফলশ্রুতিতে গ্রামের লোকেরা তাদের আলিম বা সর্দারের অধীনে যুদ্ধ শুরু করে।

রাশিয়া বুঝতে পারে, মুজাহিদরা দিন দিন কাবুলের কাছে চলে আসছে। তখন কমিউনিস্টরা তারাকীকে যবাই করে হাফীযুল্লা আমীনকে ক্ষমতায় বসায়।

আর তাকে সুযোগ দেয় মাত্র তিন মাস। অতঃপর রাশিয়া তার সর্বশক্তি নিয়ে আফগানিস্থানে ঢুকে পড়ে হাফীযুল্লা আমীনকে হত্যা করে বাবরক কারমাল নামের নতুন এক নরপশুকে ক্ষমতায় বসায়। মনে করেছিল সে হয়ত আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের অভিযানের গতিরোধ করতে সক্ষম হবে। রাশিয়া মনে করেছিল আফগানিস্থানে তা অভিযাত্রা সফল, সহজ ও আনন্দদায়ক হবে। মনে করেছিল চেকোশ্লোভিয়া দখল করে নিতে তার আট ঘন্টা ব্যয় হলেও আফগানিস্থানে আটদিন বা তার অর্ধদিন লাগবে বেশী লাগবে। কিন্তু দেখা গেল আট দিন থেকে আট মাস ও আট মাস থেকে আট বছর পেরিয়ে যায়। এর পরেও তার সফলতা তো দূরের কথা; একের পর এক পরাজয় ও ক্ষতি তার দেহে প্রবেশ করে তাঁকে উজাড় করে দিচ্ছে। আফগানিস্থান পরিণত হয়েছে রাশিয়ার ট্যাংক ও অস্ত্র ধবংসাগারে।

আফগানদের সাথে পরিচয়

যেদিন আমি আফগানদেরকে দেখেছি, সে দিন থেকে আমি অনুভব করেছি মুসলমানই বিশ্বের সর্বাধিক প্রভাবশালী মানুষ যাকে পরাজিত করা অসম্ভব এবং মুসলমান এমন একটি উঁচু পাহাড়, যা কখনও স্বীয় জায়গা থেকে এদিক সেদিক দোলে না। এ কারণেই বিশ্ব সত্যিকারের মুসলিম মুজাহিদকে ভয় করে।

আমি একজন ফিলিস্তিনী, যে পরাজয়ের পর পরাজয়ের শিকার হয়েছে। আমার পরিবারকে দেখেছি তারা একের পর এক দেশ ত্যাগের যন্ত্রণা সহ্য করেছে। আমি আমার মাতৃভূমি থেকে বিতাড়িত হয়ে আমার দেশে* বিশ বছর কাটিয়েছি। আমি একটি গ্রামে বাস করতাম। ইয়াহুদীরা প্রায় রাত্রে আমাদের ঘরে হানা দিত। কিন্তু তাদের মুখে গুলি ছুঁড়বে এমন কাউকে পাওয়া যেত না। গুলি ছুড়লে তাঁকে পুলিশের কোয়াটারে নিয়ে কঠোর শাস্তি প্রদান করা হত।

আমি ফিলিস্তিনে বাস করেছি ও তার অবস্থা দেখেছি। ১৯৬৭ সালে আমি ফিলিস্তিনে। আমার সম্মুখ দিয়ে ইসরাঈলী ট্যাংক আমার গ্রামে প্রবেশ করেছে। কিন্তু তাদের দিকে গুলি ছোড়ার মত কেউ ছিল না। এ অবস্থায় একদিন আমি এমন এক মুসলিম জনগোষ্ঠীর মাঝে এসে পৌছালাম, যারা নিজেদের খাদ্য জোগাড় করতে সক্ষম নয়, তাদের পায়ে জুতা নেই, পেটে খাবার নেই ও পকেটে টাকা নেই। কিন্তু ইজ্জত ও সম্মান রক্ষায় তাদের শীর এত উন্নত যে, তা মেঘের সাথে টক্কর খাচ্ছে। তাদের প্রত্যেকেই যেন রাশিয়ার বিশাল বাহিনীর সম্মুখে এ কথা উচ্চারণ করছে-

مُسْلِمٌ يَا صِعَبُ لَنً تَقْهَرِيْنِيْ+صَرِمِيْ قَطِعٌ وَعَزْمِيْ حَدِيْدٌ

كُلُّ بَزْلٍ إزَا الْعَقِيْدَةُ رِيْعَتْ+دُوْنَ بَزْلِ النَُّفَُوْسِ نَزْرً زَهِيْدً

ওহে বাধার পাহাড়! পারবে না আমাকে তুমি করতে পরাজিত

আমি মুসলিম তরবারী আমার ধারাল, সংকল্প দৃঢ় লোহার মত।

আকীদায় আঘাত আসলে প্রাণ উৎসর্গ ব্যতীত

সকল ত্যাগই হল তুচ্ছ থেকে তুচ্ছতর।

আল্লাহর কসম ১৯৬৭ সালে ইয়াহুদীদের হাতে মসজিদুল আকসার পতন হওয়ার সমর পার্শ্ববর্তী আরব দেশ সমূহ থেকে আগত সৈন্যদের দশজনও নিহত হল না। মক্কা ও মদীনার পর মুসলমানদের সবচেয়ে পবিত্র ভূমিকে রক্ষার জন্য দশজন লোকও নিহত হল না। আমি ইসরাঈলী রেডিওতে শোনেছি, ‘জুনের পঞ্চম দিন ট্যাংক বহর গিয়ে আমাদের শহর দখল করে নিয়েছে।’ অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট আবদুর নাসের বাদশা হোসাইনকে সম্বোধন করে বলছে, আমরা শত্রুদের বিমানের এক তৃতীয়াংশ ভূপাতিত করেছি এখন আমাদের বিমানগুলো তেল আবিবের উপর। মাননীয় বাদশাহ শান্তি চুক্তির জন্য প্রস্তুত হোন।

মসজিদুল আকসায় প্রবেশের পর আমি ইয়াহুদীদেরকে বলতে শুনেছি, ‘মুহাম্মদ মারা গেছে, মুহাম্মদ মারা গেছে এবং কিছু মেয়ে রেখে গেছে।’ জর্ডানের সৈন্যদের প্রতিরোধের দ্বিতীয় সেক্টরে ফিরে যাওয়ার ঘোষণা দেয়ার পর এক ইয়াহুদী জোয়ান মুসজিদুল আকসায় প্রবেশ করল এবং বলল, উরশিলিম (যেরুজালেম) থেকে ইয়াছরব (মদীনা) পর্যন্ত। ইসরাঈলী প্রধানমন্ত্রী বিনগোরীন বলল, ‘অঙ্গীকার ভূমিতে (ফিলিস্তিন) আসার পর এটাই আমার সবচেয়ে ভাল দিন।’ কারণ এটা সে দিন, যে দিন পবিত্র রাজধানীর উভয় অংশ একীভূত হয়েছে।

 

রাশিয়া পরাজিত

আমি ঐ তিক্ততা ও যন্ত্রণায় জীবন কাটিয়েছি। হঠাৎ আমি এমন এক মুসলিম জনগোষ্ঠীর মাঝে এসে পৌছলাম, যারা বন্দুক নিয়ে রাশিয়ার ট্যাংকের মোকাবেলা করছে। বিদ্যমান পরিস্থিতির চাপ ও প্রাচ্যবাদীদের ষড়যন্ত্রের আঘাতে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত আরব বিশ্বের লোকেরা আফগানরা যে রাশিয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে, তা বিশ্বাসই করতে চাই না। আফগানিস্থানে আসার এক বছর পর আমি সৌদিআরবে গেলে শায়খ আবদুল মজীদ যান্দানীকে বললাম, বিজয়ের পাল্লা ভারি। তিনি বললেন, রুশ বাহিনীর? আমি বললাম, মুজাহিদ বাহিনীর। তিনি বললেন, শায়খ আবদুল্লাহ আযযাম আফগানদের প্রতি আপনার সীমাতিরিক্ত ভালবাসার কারণেই এ কল্পকথা বলছেন।

আমি বললাম হায়! যদি আমার দেশের লোকেরা আফগানদের এ বিজয়ের কথা জানত! আমি তাঁদেরকে বললাম, ওহে লোকেরা ওখানে এক সফল ব্যবসা শুরু হয়েছে। ওখানে অসম সমর ও তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধ শুরু হয়েছে। তারপরও মুজাহিদরা বিজয় লাভ করছে। তারা বলল, রাশিয়া কি মুজাহিদদের প্রতিরোধকে দ্রুত গুড়িয়ে দিতে অক্ষম! রাশিয়া তো অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্রের অধিকারী। রাশিয়া ১৯৮৫ নাগাদ তার স্টককৃত সকল অস্ত্র আফগানিস্থানে ব্যবহার করেছে। এরপর সে নবনির্মিত অস্ত্র ব্যবহার শুরু করে। অস্ত্র ও বোমা তৈরির এক সপ্তাহ পর তা আফগানিস্থানে ব্যবহার করেছে। ১৯৮৫ সালে আমাদের উপর যে বোমাগুলো ফেলানো হয়েছে তাতে ১৯৮৫ লেখা ছিল। সে মিগ ২১,২৫,২৭ যুদ্ধ বিমান আফগানিস্থানে ব্যবহার করেছে। এখন মিগ ২৭ ব্যবহার করছে, যা ২৫০ কি.মি. দূর থেকে নির্ভুলভাবে নিশানায় আঘাত করছে। লোকজন বলছে, তিন সপ্তাহ হয়ে গেছে এখনও কি জালালাবাদের পতন হয়নি? অথচ তারা মুজাহিদদের মাথার উপর এসে পৌছা ক্ষেপণাস্ত্রের কথা ভুলে যাচ্ছে। এ ক্ষেপনাস্ত্র কাবুল থেকে ছোঁড়া হয়। এর ওজন সাড়ে পাঁচ টন ও দৈর্ঘ্য ১১ মিটার। এটা যেখানে গিয়ে পড়ে, সেখানে এক কিলোমিটার পর্যন্ত ধ্বংস করে। গতকাল বা আগের দিন এরকম নয়টি ক্ষেপনাস্ত্র মুজাহিদদের উপর ছোঁড়া হয়। এর একটি তোরখামে এসে পড়ে। তোরখাম হচ্ছে খাইবার যাওয়ার করিডোর। এ ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে অনেক মানুষ নিহত হয় ও অনেক মানুষ আহত হয়।

মানুষ জানে না যে, এখন কাবুলে কম্যুনিস্ট প্রশাসনের নাভিশ্বাস শুরু হয়েছে। এখন নজীব ও গর্বাচেভ চিৎকার করে বলছে কোথায় জাতিসংঘ ও কোথায় জেনেভা চুক্তি? কোথায় পর্যবেক্ষকরা? গর্বাচেভ এখন আফগান সমস্যার সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আহবান জানাচ্ছে। আমি বললাম, সুবহানাল্লাহ! গর্বাচেভ চিৎকার করছে আন্তর্জাতিক সম্মেলনের জন্য, যাতে তাঁকে আফগানিস্থানে আটকে পড়া অবস্থা থেকে উদ্ধার করা যায়। আর অন্যদিকে আমরা নিজেরা আমাদের ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আবেদন জানাচ্ছি। চিন্তা করে দেখুন উভয়ের মাঝে কত পার্থক্য ! তবে মুজাহিদরা এমনি এ পর্যায়ে এসে পৌঁছেনি। তারা এ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে অনেক ত্যাগ ও দীর্ঘ রক্ত নদী অতিক্রম করে। এ যুদ্ধে ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের একশ ভাগের নব্বই ভাগই শাহাদাত বরণ করেছে। আফগান মুহাজিরদের সংখ্যা এখন ১২ মিলিয়ন। তন্মধ্যে সাত মিলিয়ন আফগানিস্থানে। তারা ঘর-বাড়ি ছেড়ে বন-জঙ্গল ও পাহাড়ে আশ্রয় নিয়েছে। সাড়ে তিন মিলিয়ন পাকিস্থানে ও দেড় মিলিয়ন ইরানে। আকীদার কারনেই তাদের এ অবস্থা। নতুবা তারা গ্রাম ও শহরে বাস করতে পারত। নজীব* কয়েক বছর ধরে তাঁদেরকে পাকিস্থান থেকে ফিরে যাবার প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু তারা যায়নি। কারণ, তারা দ্বীনদার ও আকীদাধারী। তাদের এ যুদ্ধ প্রথম দিন থেকে আকীদার উপর ভিত্তি করেই সংঘটিত হয়েছিল।

পশ্চিমা ও বামপন্থী মিডিয়া আরব বিশ্বে এ ধারণা ছড়িয়ে দিতে প্রাণপন চেষ্টা করছে যে, আফগানিস্থানের এ যুদ্ধ গৃহযুদ্ধ । হ্যাঁ! এ যুদ্ধ আফগানদের সাথে আফগানদের যুদ্ধ বটে। তবে তা দ্বীন ও আকীদা কেন্দ্রিক যুদ্ধ, মুসলিম ও কাফিরের যুদ্ধ, মুমিন ও মুরতাদের যুদ্ধ এবং আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠাকামী ও কম্যুনিস্টদের যুদ্ধ। পৃথিবীতে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠার জন্য এদের সাথে যুদ্ধের বিকল্প নেই।

রাশিয়া আফগানিস্থানের পরাজয়ের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে আমেরিকাকে বলল, আমরা আফগানিস্থান থেকে চলে আসতে চাই। তবে আফগানিস্থানে ক্ষমতার বসানোর জন্য বিকল্প একজনকে দেন। এ কট্টর মৌলবাদীরা আমাদের জন্যে যেমন ক্ষতিকর, তেমনি তোমাদের জন্যেও ক্ষতিকর। এরপর তারা জেনেভায় সম্মেলন করে চুক্তি করল যে, মুজাহিদদেরকে জিহাদের সকল ফল থেকে বঞ্চিত করা হবে।

তারা মাত্র এক বছর পূর্বে মুসলিম ও আরব বিশ্বে এসে বলেছে, এ আফগানদের ব্যাপারে আমাদের সহায়তা করুন। আফগান যুদ্ধ, উপসাগরীয় যুদ্ধ ও ফিলিস্তিন সমস্যা একই সুত্রে গাঁথা। তারা বলছে যদি আমাদেরকে আফগান যুদ্ধ বন্ধকরণে সাহায্য করেন, তাহলে আমরা উপসাগরীয় যুদ্ধ বন্ধ করব এবং ফিলিস্তিন সমস্যা সমাধানের জন্য একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন ডাকব। তারা জিয়াউল হকের কাছে একজন আরব শাসক পাঠাল যাতে সে তাঁকে জেনেভা চুক্তিতে স্বাক্ষর করাতে রাজী করতে পারে। সে এসে তিন ঘন্টা পর্যন্ত জিয়াউল হকের কাছে জেনেভা চুক্তিতে স্বাক্ষরের প্রয়োজনীয়তা তিন ঘন্টা পর্যন্ত ব্যাখা করে বুঝাল। জিয়াউল হক তাঁকে বললেন, এতদিন আপনারা কোথায় ছিলেন? শেষ মুহূর্তে এসে আফগান জিহাদকে লেবাননের লড়াই ও ইসরাঈলী গাড়ীর নীচে মাইন পুঁতে রাখার সাথে তুলনা করতে এসেছেন? আফগানিস্থানের জিহাদে দশ বছরের অধিক কাল ধরে চলে আসা একটি রক্তাক্ত যুদ্ধ এবং রাশিয়া এতে পরাজিত। সে বলল, রাশিয়া পরাজিত? জিয়াউল হক বললেন,হ্যাঁ ! রাশিয়া পরাজিত।

আমেরিকা ও পাকিস্থান মিডিয়ার রেকর্ডকৃত যুদ্ধের চিত্র ও ক্ষয়ক্ষতি আমাদেরকে হতবাক করেছে। ১৯৮৮ এর জানুয়ারী পর্যন্ত রেকর্ডকৃত হিসাব অনুযায়ী রাশিয়ার ৪১৬০টি যুদ্ধ বিমান ধবংস হয়েছে। ইসরাঈলী সেনাবাহিনীর তিনগুন সেনাবাহিনী রাশিয়া এ পর্যন্ত আফগানিস্থানে হারিয়েছে। ট্যাংক হারিয়েছে ২০৮০ টি । অস্ত্র হারিয়েছে ২১ হাজার। রাশিয়ার দাবী মতে নিহত ও আহত রাশিয়ান সৈন্যের সংখ্যা ৫০ হাজার। যুদ্ধে রাশিয়ান সৈন্যদের পিছনে প্রতিদিন ব্যয় হয়েছে ৪৫ মিলিয়ন রুপি। জিয়াউল হক তাঁকে বললেন, আপনি কী ভাবছেন? আফগানিস্থানের জিহাদকে কি আপনি ফিলিস্তিন সমস্যার মত মনে করেছেন?

১৯৭৮ থেকে ১৯৮৮ জ্বিহাদ বিরামহীনভাবে চলছে। কা’বার তাওয়াফের মত আফগানিস্থানে জ্বিহাদও এক মুহূর্তের জন্য বন্ধ হয়নি। দিন-রাত ও গরমকাল শীতকালে কা’বার তাওয়াফ এক মুহূর্তের জন্যেও বন্ধ হয় না। অনুরূপ আফগানিস্থানেও এক মুহূর্তের জন্যেও জ্বিহাদ বন্ধ হয়নি। কোন না কোন এলাকায় গুলি ছোঁড়া হচ্ছে। আমি মনে করি না এ দীর্ঘ চৌদ্দ বছরে এক মুহূর্তের জন্যে আফগানিস্থান লড়াই থেকে মুক্ত ছিল। তাই মনে করবেন না যে, রাশিয়া এমনিতে বের হয়ে গেছে। পত্রিকায় লেখা হচ্ছে যে, রাশিয়া আফগানিস্থান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নিয়েছে। রাশিয়া তার সৈন্যদের এমনিতে প্রত্যাহার করে নিচ্ছে না। সে লজ্জাকর পরাজয় বরণ ও নিজেকে ধ্বংস করার পর আফগানিস্থান থেকে বের হতে যাচ্ছে।

এক রাশিয়ার সৈন্যের স্বীকারোক্তি

কাবুল থেকে ফিরে যাওয়া একজন রাশিয়ান সৈন্যের নিকট রাশিয়ান টেলিভিশন প্রশ্ন করেছে আফগানিস্থানে তোমাদের দিন-কাল কেমন গেছে? সে বলল, ‘যখন আমরা আল্লাহু আকবর হুংকার শোনতাম, তখন আমরা কাপড়ের মধ্যে পেশাব করে দিতাম।’ এ কথা রাশিয়ান টেলিভিশন প্রচার করেছে।

আফগান জ্বিহাদ গর্বাচেভের অন্তরে কম্যুনিস্ট চিন্তাধারার পরিবর্তন ঘটিয়েছে। সে এখন কম্যুনিজমকে অস্বীকার করতে বসেছে। এ মাসের মধ্যেই তার থেকে কম্যুনিস্ট চিন্তা-ধারা বিদায় নিয়েছে। পত্রিকায় তাদের বিবৃতি পড়ে দেখুন। গর্বাচেভ এখন নতুনভাবে চিন্তা করতে শুরু করেছে। তারা বলেছিল ধর্ম মানুষের জন্য আফিম। কিন্তু দেখা গেল এখন ধর্মই পৃথিবীর সর্ববৃহৎ শক্তিকে পরাজিত করছে। তারা বলেছিল ধর্ম মানুষের রক্ত চোষণকারী জোঁক। কিন্তু দেখা গেল আফগানদের ধর্ম কম্যুনিজমের শক্তিধর বাহিনীকে পরাজিত করছে।