মাওলানা আজম তারিক – ইমরান রাইহান

১.

১৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৯২। ফয়সালাবাদ, পাকিস্তান। 

সিপাহে সাহাবার উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হচ্ছে পয়গাম্বরে ইনকিলাব কনফারেন্স। শুরু থেকেই পরিস্থিতি থমথমে। সভাস্থলের পাশেই শিয়াদের ইমামবাড়া। শিয়ারা হুমকি দিয়েছিল, সিপাহে সাহাবার অনুষ্ঠানে শিয়াদের ব্যাপারে কোনো কথা বলা যাবে না। ইরানের শিয়া বিপ্লব নিয়েও চুপ থাকতে হবে। এর অন্যথা হলে তারা আক্রমন করবে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে রাখতে প্রশাসন অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে। 

এশার নামাজের পর মঞ্চে উঠলেন একজন তরুণ আলেম। ত্রিশের কোঠায় বয়স। তিনি সাহাবায়ে কেরামের শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা নিয়ে কথা বলতে শুরু করেন। শিয়াদের লিখিত বইপত্রে সাহাবায়ে কেরাম ও উম্মাহাতুল মুমিনিনদের যে অসম্মান করা হয়েছে, তা বলতে থাকেন। আবেগে তাঁর কন্ঠ ভারী হয়ে আসে। তিনি বলেন, ইরানের শিয়া বিপ্লব কখনোই মুসলমানদের আদর্শ হতে পারে না। 

আচমকা গুলির শব্দ শোনা যায়। একের পর এক গুলি এগিয়ে আসে সভাস্থলের দিকে। দুয়েকটি বুলেট মঞ্চের একেবারে কাছে এসে পড়ে। গুলি আসছে ইমামবাড়ার দিক থেকে। গুলি শুরু হতেই পুলিশবাহিনী সরে যায়। সিপাহে সাহাবার নিয়োজিত নিরাপত্তারক্ষিরা পালটা জবাব দিতে থাকে। মুহুর্মুহু গুলির শব্দে আকাশ বাতাস ভরাট হয়ে আসে। 
আলোচক আলেম বিন্দুমাত্র চমকালেন না। আলোচনাও থামালেন না। তিনি উচ্চকন্ঠে বলে চললেন, ভয়ের কিছু নেই। এই গুলি , শাহাদাত এসব আজ নতুন নয়। আমরা সাহাবায়ে কেরামের শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা নিয়ে কথা বলেই যাব। এই গুলি, হাতকড়া, কারাগার আমাদের থামাতে পারবে না। 

(সেই সম্মেলনের ভিডিও – ৫২ মিনিট ৪০ সেকেন্ড থেকে গোলাগুলির শব্দ শোনা যাবে) 

২.

বক্তৃতার মঞ্চে আকাশ কাঁপানো শ্লোগান দেয়া সহজ, কিন্তু গুলির মুখে দৃঢ়তা দেখানো কঠিন। ফয়সালাবাদের অনুষ্ঠানে এই আলেম দৃঢ়তা দেখাতে পেরেছিলেন, কারণ তিনি এর আগেও বহুবার গুলির মুখোমুখি হয়েছেন। ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি আফগান রনাংগনে লড়েছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে। তিনি শুনেছিলেন ক্লাশিনকভের শব্দ, মাথার উপর গর্জাচ্ছিল বোমারু বিমান, নিচে পাথুরে ভূমি দিয়ে এগিয়ে আসছিল সোভিয়েতদের ট্যাংকবহর, আর তখন, জীবন ও মৃত্যুর মাঝামাঝি অবস্থান করে তিনি রবের সাথে কৃত ওয়াদা আবার সত্যায়ন করে নিচ্ছিলেন। প্রচন্ড মার খেয়ে সোভিয়েতরা আফগানিস্তান থেকে বিদায় নেয় ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে। কিন্তু খোস্ত তখনো মুজাহিদদের হাতে আসেনি। খোস্ত বিজিত হয়েছিল ১৯৯১ এর শুরুর দিকে। ১৯৯০ এর মাঝামাঝি থেকে তিনি লড়ছিলেন খোস্ত রনাংগনে। এখানেও তিনি সাহসিকতার পরিচয় দেন। 

৩.

৩ মে ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দ। কওমি এসেম্বলি, পাকিস্তান। 

আমাদের সেই সাহসি আলেম এসেছেন সংসদে। সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিবেন তিনি। স্পিকার শপথ করাবেন। আলেমের সামনেও শপথের কাগজ দেয়া হয়েছে। আলেম পুরো শপথ একবার পড়লেন। এক অংশে লেখা আছে, আমি পাকিস্তানের আইন-কানুন মেনে চলবো। তিনি পকেট থেকে কলম বের করে এই অংশ কেটে দিলেন। পাশে লিখলেন, পাকিস্তানের যেসকল আইন কুরআন সুন্নাহর সাথে সাংঘর্ষিক নয়, আমি তা মেনে চলবো। এরপর সাক্ষর করলেন। শপথ শুরু হলো। স্পিকার শপথ করাচ্ছেন। স্পিকার শপথের এই অংশে এসে বললেন, আমি পাকিস্তানের আইন-কানুন মেনে চলবো। আলেম বললেন, পাকিস্তানের যেসকল আইন কুরআন সুন্নাহর সাথে সাংঘর্ষিক নয়, আমি তা মেনে চলবো। স্পিকার চমকে গেলেন। সংসদের ইতিহাসে কখনো কেউ শপথবাক্যে পরিবর্তন করেনি। আলেমের দিকে তাকালেন তিনি। কিন্তু আলেমের চেহারার দৃঢ়তার সামনে টিকতে না পেরে চোখ নামিয়ে নিলেন। শপথ পড়ানো শেষ করলেন। এদিকে সংসদ সদস্যরা অর্ডার অর্ডার বলে হট্টগোল শুরু করে। সবার এক কথা, আলেম তাঁর শপথে পরিবর্তন এনেছেন। তাই শপথ হয়নি। আবার পড়াতে হবে। আলেম দাঁড়িয়ে গেলেন। দৃঢ়কন্ঠে বললেন, আমাকে যদি একশো বারও শপথ পড়ানো হয় আমি এই কথাই বলবো। আলেমের ভরাট কন্ঠে গমগম করে উঠলো পুরো সংসদ। স্পিকার কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, শপথ আর নেয়ার দরকার নেই। শপথ হয়ে গেছে। 

(এই শপথপাঠের অডিও শুনতে)

৪.

এই আলেমের নাম মাওলানা আজম তারিক। ১০ জুলাই ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে পাঞ্জাবে তাঁর জন্ম। পড়াশোনা করেছেন জামিয়া উলুমিল ইসলামি বিন্নুরি টাউনে। এখানে তাঁর সহপাঠি ছিলেন শায়খ মাসউদ আজহার। পড়াশোনা শেষে তিনি মাওলানা হক নেওয়াজ জংগভির সংস্পর্শে আসেন। ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে হক নেওয়াজ জংগভি, জিয়াউর রহমান ফারুকি, ইসারুল কাসেমি প্রমুখ সিপাহে সাহাবা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করেন। এই দল প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিল শিয়াদের পক্ষ থেকে সাহাবায়ে কেরাম ও উম্মাহাতুল মুমিনিনদের চরিত্রের উপর যে মিথ্যা অপবাদ লেপন করা হয় তার জবাব দেয়া। মাওলানা আজম তারিক শুরু থেকেই এই জামাতের সাথে ছিলেন। অন্যান্য আলেমদের সাথে তিনিও সারাদেশ সফর করতে থাকেন। একের পর এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে থাকে। উম্মোচিত করা হয় শিয়াদের ষড়যন্ত্রের নানারুপ। এ সময় সিপাহে সাহাবার সদস্যরা শিয়াদের আক্রমন ও হামলার শিকার হতে থাকে। বহিরাগত শক্তির চাপে প্রশাসনও সিপাহে সাহাবার উপর খড়গহস্ত হয়ে উঠে। ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে নিজের বাসভবনে আততায়ীর হামলায় নিহত হন হক নেওয়াজ জংগভি। (আল্লাহ তাঁর শাহাদাত কবুল করুন)। ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে হত্যা করা হয় ইসারুল কাসেমিকে। মাওলানা আজম তারিকের উপর একাধিকবার হামলা হয়। ১৭ জানুয়ারি ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে লাহোর সেশন কোর্টে তাঁর উপর হামলা হয়। তিনি আহত হলেও বেঁচে যান। করাচিতে হামলা করা হলে তিনি গুলিবিদ্ধ হন। কিন্তু শীঘ্রই সুস্থ হয়ে উঠেন। আবার সারাদেশে সফর শুরু করেন। তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। সংসদে তিনি সাহাবায়ে কেরামের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে তেজদীপ্ত ভাষণ দিতেন। এ সময় তাঁর কন্ঠ চড়ে যেত। একবার সংসদে একজন সংসদ সদস্য উঁচু গলায় বক্তব্য রাখলে স্পিকার তাকে বলে, এত জোরে কথা বলছেন কেন? আপনি তো আজম তারিক নন। 

মাওলানা আজম তারিক তাঁর সারাজীবন ব্যয় করেছেন সাহাবায়ে কেরামের সম্মান ও মর্যাদা প্রচারের কাজে। সামনে হাজারও বাঁধা এসেছে কিন্তু তিনি পিছু হটেননি। তাকে একাধিকবার গ্রেফতার করা হয়। তিনি গ্রেফতার হলেই তাঁর জন্য পেরেশান হয়ে উঠতেন সবাই। তিনি ছিলেন দেওবন্দি ঘরানার আলেম। কিন্তু কারাগারে তাকে দেখতে ছুটে যেতেন জামাতে ইসলামি ও আহলে হাদিস ঘরানার আলেমরাও। তাকে দেখার জন্য কারাগারে ছুটে গিয়েছিলেন ডক্টর আল্লামা খালেদ মাহমুদের মত বরেণ্য ব্যক্তিত্বরাও। তিনি কারাগারে থাকা অবস্থাতেই ইমারতে ইসলামিয়া আফগানিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি কারাগার থেকে ইমারতের প্রতি আনুগত্যের চিঠি লিখেন। 

১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে সিপাহে সাহাবার তৎকালীন আমির জিয়াউর রহমান ফারুকি আততায়ির হামলায় নিহত হলে দলের দায়িত্ব নেন মাওলানা আজম তারিক। এরপর তাকে হত্যার জন্য একাধিকবার হামলা চালানো হয়। এমনকি এ সময়ে ইরানি গোয়েন্দাসংস্থার একটি হামলার পরিকল্পনার কথাও প্রকাশিত হয়। কিন্তু তিনি এসব কিছুতেই ভয় পেতেন না। 

৫.

৫ অক্টোবর, ২০০৩ খ্রিস্টাব্দ। 

রাত একটা। পীর আজিজুর রহমান হাজারবি ফোন করলেন মাওলানা আজম তারিককে। মাওলানা আজম তারিক অবাক হলেন। 

‘হজরত , এত রাতে আপনি? জরুরি কোনো বিষয়?’
‘মাত্র একটা স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙ্গে গেল। মনে হল তোমাকে জানানো দরকার। আমি একটু আগে স্বপ্নে দেখলাম ইসলামাবাদের রাস্তায় আম্মাজান আয়েশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু আনহা দাঁড়িয়ে আছেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আম্মাজান আপনি এখানে কেনো? আম্মাজান বললেন, আমি আমার সন্তান আজম তারিককে নিতে এসেছি। এরপর আমার ঘুম ভেংগে যায়’

একথা শুনে মাওলানা আজম তারিক কাঁদতে থাকেন। কিছুক্ষণ পর একটু ধাতস্থ হয়ে বলেন, হজরত আপনি তো এ স্বপ্ন আজ দেখেছেন। আমি গত আট রাত ধরে প্রতিরাতেই আম্মাজানকে স্বপ্নে দেখছি। 

৬.

৬ অক্টোবর ২০০৩। কাশ্মির হাইওয়ে, ইসলামাবাদ, পাকিস্তান। বিকাল ৪ টা ২৫ মিনিট। 

মাওলানা আজম তারিক জং থেকে ফিরছিলেন। গাড়িতে তাঁর সাথে আরো চারজন সফরসঙ্গী ছিলেন। শহরের প্রবেশের সময় থেকেই একটি সাদা পাজারো তাঁর গাড়িকে অনুসরণ করছিল। শহরের টোল প্লাজা অতিক্রম করতেই পাজারোটি মাওলানা আজম তারিকের গাড়ির পাশে চলে আসে। একে ফোরটি সেভেন থেকে একের পর এক গুলি চলতে থাকে মাওলানার গাড়ির উদ্দেশ্যে। ড্রাইভার আহত হন। 

মাওলানার গাড়ি থেমে যায়। পাজারো থেকে তিনজন অস্ত্রধারী নেমে আসে। তারা ৩/৪ মিটার দূরে দাঁড়িয়ে মাওলানার গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি করতে থাকে। মাত্র ২/৩ মিনিটেই প্রায় দুইশো রাউন্ড গুলি করা হয়। এরপর দ্রুত গাড়িতে উঠে পালিয়ে যায়। মাওলানা ও তাঁর সফরসঙ্গীরা ঘটনাস্থলেই নিহত হন। মাওলানা আজম তারিকের শরির ঝাঁঝরা হয়ে যায় বুলেটের আঘাতে। ময়নাতদন্তে দেখা যায় তাঁর শরিরে ৪৩ টি বুলেট লেগেছিল। 

৭.

সিপাহে সাহাবার অন্যান্য নেতৃবৃন্দের হত্যাকান্ডের মতই এই হত্যাকান্ডেরও কোনো বিচার হয়নি। তবে সিপাহে সাহাবার নেতৃবৃন্দের দাবী এই হামলায় সরাসরি ইরান জড়িত ছিল। 

এই হত্যাকান্ডের চার্জশিটে এসেছে শিয়া নেতা সাজিদ আলি নকবির নাম। শুধু এই হত্যাকান্ড নয়, অন্তত বিশটি হত্যাকান্ডের মামলায় তাঁর নাম আছে। তবু কোনো একশন নেয়া হচ্ছে না তাঁর বিরুদ্ধে। এদিকে ঐক্যের আহবানে তাঁর কাছে ছুটে যাচ্ছেন জমিয়ত নেতা ফজলুর রহমান। 

দিনশেষে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে ক্ষমতাই হয়ে উঠে বন্ধুত্ব ও শত্রুতা তৈরির মাপকাঠি।