শামসুদ্দিন ইলতুৎমিশ : যে দাস-সুলতান ভারতবর্ষে মুসলিম শাসনের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা

ইতিহাসে যেসকল মানুষ ক্রীতদাসের জীবন থেকে উঠে এসে বিশ্বব্যাপী কীর্তি গড়ে গেছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন সুলতান শামসুদ্দিন ইলতুৎমিশ। দিল্লি সালতানাতের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বিবেচিত শামসুদ্দীন ইলতুৎমিশ তুর্কিস্তানের ইলবারি গোত্রের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। জনশ্রুতি আছে যে, ইলতুৎমিশের বুদ্ধিমত্তা, বিচক্ষণতা ও সুদর্শন চেহারা তাঁর ভাইদের মনে ঈর্ষার উদ্রেক করে এবং তারা তাঁকে বাল্যকালে ক্রীতদাসরূপে বিক্রি করে দেয়। অবশ্য দুর্ভাগ্য তাঁর গুণাবলিকে নষ্ট করতে পারেনি। দিল্লির শাসনকর্তা কুতুবউদ্দীন তাঁর নৈপূণ্যে আকৃষ্ট হয়ে তাঁকে উচ্চমূল্যে ক্রয় করেন। ইলতুৎমিশের পদমর্যাদা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকে। তিনি দিল্লির সুলতান কুতুবউদ্দীনের অধীনে বাদায়ুনের শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। তাঁর সঙ্গে সুলতানের এক কন্যার বিবাহ দেওয়া হয়। ইলতুৎমিশ ১২১০ খ্রিষ্টাব্দে দিল্লির সিংহাসনে আরোহন করেন।

১২০৬ সাল থেকে শুরু করে ১৫২৬ সাল পর্যন্ত মোট ৩২২ বছর হিন্দুস্তান একক কোনো মুসলিম রাজবংশের দ্বারা পরিচালিত হয়নি। বরং একাধিক মুসলিম রাজবংশ এই দীর্ঘ সময় হিন্দুস্তানকে শাসন করেছে। ১২০৬ থেকে ১৫২৬ সাল পর্যন্ত হিন্দুস্তান নিয়ন্ত্রণকারী এই একাধিক তুর্কি আর আফগান মুসলিম রাজবংশের শাসনকে একত্রে ‘দিল্লি সালতানাত‘ বা ‘দিল্লির সুলতানশাহি’ নামে অভিহিত করা হয়। সাম্রাজ্যগুলো হলো মামলুক সালতানাত, খিলজি সালতানাত, তুঘলক সালতানাত, সৈয়দ রাজবংশ আর লোদি রাজবংশীয় শাসন। দীর্ঘ এই তিনশ বছরের মুসলিম শাসনের গোড়াপত্তন করেন শামসুদ্দিন ইলতুৎমিশ। একজন ক্রীতদাসের পক্ষে এতদূর উঠে আসা নেহাৎ সহজ ছিল না। সুলতান ইলতুৎমিশ দিল্লির সিংহাসনে আরোহন করার পূর্ববর্তী প্রেক্ষাপটগুলিও ছিল নাটকীয়তায় ভরা। সেদিকে কিঞ্চিৎ দৃষ্টিপাত করা যাক।

ইলতুৎমিশ এসেছিলেন কুতুবুদ্দিন আইবেকের হাত ধরে। সুলতান কুতুবুদ্দিনের আগে দিল্লির মসনদে সমাসীন ছিলেন নিঃসন্তান সুলতান মুইজ উদ্দীন মুহাম্মদ শিহাবউদ্দীন ঘুরি। কথিত আছে, মৃত্যুর পর তাঁর কোনো উত্তরাধিকারী থাকবে না বলে দরবারের কেউ একজন আফসোস করেছিলেন। তা শুনে সুলতান মন্তব্য করেন, অন্যান্য শাসকদের সন্তান থাকে একজন বা দুইজন, কিন্তু আমার সন্তান আছে হাজার হাজার। তারাই আমার সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী হবে। সত্যিকার অর্থেই মুহাম্মদ ঘুরি তার তুর্কী দাসদের সন্তানতুল্য মনে করতেন। তাদের খুব উন্নতমানের প্রশিক্ষণ দেয়া হতো। যোগ্যতার ভিত্তিতে অনেক তুর্কি দাসই পরবর্তীতে সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদ অর্জন করেছিলেন।

সে যাই হোক, সুলতান মুহাম্মদ ঘুরির অনুমান সত্য প্রমাণিত হয়। ১২০৬ সালের ১৫ মার্চ মাগরিবের নামাজ আদায়রত অবস্থায় খোকাররা শিহাবুদ্দীন মুহাম্মদ ঘুরিকে হত্যা করে। মৃত্যুর পর তার সাম্রাজ্য বিশ্বস্ত সেনাপতিদের মাঝে ভাগ হয়ে যায়। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য চার সেনাপতি সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ চারটি অংশ পান।

তাজ উদ্দীন ইলদিজ হন গজনির শাসক। ১২১০ সালে নাসির উদ্দীন কাবাচার ভাগে পড়ে মুলতান। কুতুবুদ্দীন আইবেক ১২০৬ সালেই দিল্লীর সিংহাসনে একজন স্বাধীন নৃপতি হিসেবে আরোহণ করেন। আর ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজি দায়িত্ব পান বাংলার।

প্রথম জীবনে কুতুবুদ্দীন আইবেকও মুহাম্মদ ঘুরির একজন ক্রীতদাস ছিলেন। পর্যায়ক্রমে নিজের যোগ্যতা প্রদর্শন করে সেনাবাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করেন। তিনি নিজে প্রাথমিক জীবনে দাস থাকার কারণে তার প্রতিষ্ঠিত সাম্রাজ্যকে দাস সাম্রাজ্য নামে অভিহিত করা হয়। এই দাস শাসনামল ১২০৬ থেকে ৯০ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিলো।

সুলতান কুতুবুদ্দীন আইবেক অত্যন্ত ধার্মিক আর ন্যায়বিচারক ছিলেন। তিনি হিন্দু আর মুসলিম প্রজাদের মাঝে পার্থক্য না করে সবসময় ন্যায়বিচার করতেন। তবে কুতুবুদ্দীন আইবেক বেশি দিন হিন্দুস্তান শাসন করতে পারেন নি। সিংহাসনে বসার মাত্র ৪ বছর পর, ১২১০ সালে, লাহোরে পোলো খেলার সময় ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে মারা যান। তাঁকে লাহোরেই সমাহিত করা হয়।

কুতুবুদ্দীন আইবেকের পর দিল্লীর ক্ষমতায় আসেন আরাম শাহ। শাহের অযোগ্যতা আর জনসাধারণের চাহিদার ভিত্তিতেই আরাম শাহকে পরাজিত করে দিল্লীর সিংহাসন লাভ করেন ইলতুৎমিশ। তিনি ১২১১ থেকে ৩৬ সাল পর্যন্ত দিল্লীর সুলতান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই পঁচিশ বছরের শাসনামলে সুলতান ইলতুৎমিশ বহুবিধ সমস্যার সম্মুখীন হন। তখন বাংলার পশ্চিম ও উত্তর অঞ্চলই শুধু মুসলিম অধিকারভুক্ত ছিল। ইলতুৎমিশের সিংহাসন লাভের পূর্বেই আলী মর্দান খিলজীর নেতৃত্বে লখনৌতির মুসলিম রাজ্য স্বাধীনতা ঘোষণা করে। ইলতুৎমিশ প্রথমেই তাঁর রাজধানী লাহোর থেকে দিল্লীতে স্থানান্তর করেন। তার শাসনামলে হঠাৎ করেই হিন্দুস্তান বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে। আঞ্চলিক বিদ্রোহীরা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। মুলতানের নাসিরুদ্দীন কাবাচা আর গজনীর তাজউদ্দীনও আগ্রাসী হয়ে ওঠে।

অপরদিকে তাজউদ্দীন ইলদিজ গজনীতে নিজের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। নাসির উদ্দিন কুবাচাহ মুলতানের স্বাধীনতা ঘোষণা করে উচ আর লাহোর দখল করে নেন। ইলতুৎমিশ তাদের দুজনকেই কঠোর হস্তে দমন করেন। ১২২৫ সালে বাংলা তার পদানত হয়। ১২৩২ সালে তিনি গোয়ালিয়র দখল করেন।

সুলতানের জীবন ছিল বহুমুখী ঝঞ্চাবিক্ষুদ্ধের জীবন। একদিকে যখন বাংলার বিদ্রোহ দমন করছেন, অপরদিকে একই বছরে অর্থাৎ ১২২৫ খ্রিস্টাব্দের দিকে সুলতান নিজ উদ্যোগে ইওয়াজের বিরুদ্ধে ইকদামি জিহাদ পরিচালনা করেন। অবশেষে একটি সন্ধির মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান ঘটে। সন্ধির শর্তানুসারে ইওয়াজ খিলজী ইলতুৎমিশের নামে খুতবাপাঠ ও মুদ্রা চালু করতে এবং যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ বাবদ ৮০ লক্ষ টাকা ও ৩৮টি হাতি প্রদানের অঙ্গীকার করেন।

বিহারকে তখন বাংলা থেকে পৃথক করে আলাউদ্দীন জানীকে বিহারের শাসনকর্তা নিযুক্ত করা হয়। কিন্তু সুলতান দিল্লিতে ফিরতে না ফিরতেই ইওজ আবার বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তিনি আলাউদ্দীন জানীকে বিহার থেকে বিতাড়িত করেন। সুলতান তখন আলাউদ্দীন জানীসহ তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র নাসিরউদ্দীন মাহমুদকে ইওয়াজের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন। যুদ্ধে ইওয়াজ নিহত হন এবং লখনৌতি আবার দিল্লি সালতানাতের একটি প্রদেশে পরিণত হয় (১২২৭)। শাহজাদা নাসিরউদ্দীন মাহমুদ ১২২৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত বাংলা শাসন করেন।

বাংলার পরবর্তী শাসনকর্তা ছিলেন আলাউদ্দীন দৌলত শাহ খিলজী (১২২৯-১২৩০)। কিন্তু শীঘ্রই বলকা খিলজী তাঁকে ক্ষমতাচ্যূত করেন। এ অবস্থায় বিদ্রোহ দমনের জন্য ইলতুৎমিশ পুনরায় বাংলা অভিমুখে অভিযান পরিচালনা করেন। বলকা খিলজী পরাজিত হন এবং ১২৩১ খ্রিস্টাব্দে তাকে হত্যা করা হয়। অতঃপর ইলতুৎমিশ বাংলায় শান্তিশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারের জন্য মালিক আলাউদ্দীন জানীকে নিয়োগ দেন। তিন বছর শাসনের পর আলাউদ্দীন জানী স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এ সংবাদ পেয়ে সুলতান ইলতুৎমিশ আলাউদ্দীন জানীকে প্রত্যাহার করে সাইফউদ্দীন আইবেককে বাংলার শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। কিন্তু অচিরেই সাইফউদ্দীনের মৃত্যু ঘটে। এরপর ইলতুৎমিশ ইজ্জউদ্দীন তুগরল তুগান খানের ওপর বাংলার শাসনভার ন্যস্ত করেন। ইলতুৎমিশের প্রতি ইজ্জউদ্দীন বিশ্বস্ত ছিলেন। এভাবে বাংলায় ইলতুৎমিশের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।

সুলতান ছিলেন রাজনৈতিক ধী সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব। পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বর্বর ব্যক্তিদের তালিকা করতে গেলে চেঙ্গিস খানের নাম উপরের দিকেই থাকবে। সুলতান কুতুবুদ্দীন আইবেক যে বছর সিংহাসনে বসেন, সেই বছরেই অর্থাৎ ১২০৬ সালে চেঙ্গিস খান সমগ্র মঙ্গোলিয়ার একক অধিপতি রূপে আবির্ভূত হন। তাকে ‘চেঙ্গিস খান’ উপাধি দেয়া হয়। ইতিহাস সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা আছে, এমন ব্যক্তি মাত্রই এই মঙ্গোলিয়ান আগ্রাসনের কথা জানেন।

মধ্য এবং উত্তর এশিয়ার ধূ ধূ প্রান্তর থেকে উঠে আসা যাযাবর এই গোষ্ঠীগুলোই এই সময়ে পরিণত হয়েছিলো পৃথিবীর দুঃস্বপ্নে। হত্যা থেকে শুরু করে লুণ্ঠন, ধর্ষণ, গণহত্যা–এমন কোনো অপরাধ নেই যে এই বর্বর মঙ্গোলরা করেনি। এক চেঙ্গিস খানের অন্যায় আগ্রাসনে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছিলেন প্রায় ৪ কোটি মানুষ। গণহত্যা, বর্বরতা আর নৃশংসতার মাধ্যমে হঠাৎ তারা বিশাল এক ভূখণ্ড দখল করে ফেলেছিল।

সুলতান ইলতুৎমিশের সমসাময়িক আরেক বিখ্যাত যোদ্ধা জেনারেল ছিলেন জালাল উদ্দীন খোয়ারিজমী। চেঙ্গিস খানের সাথে তার বিরোধ বেঁধে যায়। কিন্তু যুদ্ধে চেঙ্গিস খানের কাছে পরাজিত হন। পরাজিত হয়ে তিনি ইলতুৎমিশের কাছে আশ্রয় চান। ইলতুৎমিশ ভালোই বুঝতে পেরেছিলেন তার সাম্রাজ্যের এই অশান্ত অবস্থায় জালাল উদ্দিনকে আশ্রয় দেয়ার মানে হচ্ছে চেঙ্গিস খানের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়া। কিন্তু তিনি হিন্দুস্তানকে তখনই চেঙ্গিস খানের বর্বর থাবার শিকারে পরিণত হতে দিতে চাননি। এতে জালাল উদ্দীন নিরাশ হন।

ইলতুৎমিশ ন্যায়পরায়ণ শাসক হবার পাশাপাশি ছিলেন ধর্মভীরু এবং আল্লাহওয়ালা ব্যক্তিত্ব। ১২২৯ সালে বাগদাদ-কেন্দ্রিক আব্বাসীয় খলিফা আল মুন্তাসির তাঁকে ‘সুলতান-উল-হিন্দ’ উপাধি দান করেন।

১২৩৬ সালের এপ্রিল মাসে সুলতান শামসুদ্দীন ইলতুৎমিশ ইন্তেকাল করেন। ইলতুৎমিশের মৃত্যুর পর তাঁর কন্যা রাজিয়া দিল্লির সিংহাসনে বসেন।


কাজী মাহবুবুর রহমান
মূলঃ fateh24