বড়দের মুখে বড়দের বেড়ে ওঠার কাহিনী – মুহাম্মাদ হাবীবুর রহমান খান (৭ম পর্ব)

উস্তায ও আকাবিরের অনুসরণ

হাকীমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রাহ. প্রায়ই স্বীয় উস্তাযগণের উচ্চ মর্যাদা ও ইলমের কথা এমন আগ্রহভরে বর্ণনা করতেন যে, শ্রোতাদের মধ্যে আত্মহারাভাব সৃষ্টি হতো এবং তাদের মনে সালাফে সালেহীনের আদর্শ ফুটে উঠতো। তিনি এসকল আলোচনায় প্রায়ই আরবী কবিতার নিম্নোক্ত পংক্তি আবৃতি করতেন।

أولئك آبائي + فجئنى بمثلهم

(এঁরাই মোদের পূর্বসূরী

লও তো দেখি তাঁদের জুরি)

শ্রোতাগণ সাথে সাথে এটাও প্রত্যক্ষ করতেন যে, এসকল গুণের সমাবেশ হযরত হাকীমুল উম্মত রাহ.-এর মধ্যেও পূর্ণ মাত্রায় ঘটেছে। তিনি তাঁর উস্তায ও মুরুববীদের অনুসরণে পোশাক পরিচ্ছদেও পরিবর্তন এনেছিলেন। কেবল যে তাদের বাহ্যিক অনুসরণ করতেন তাই নয়, বরং মন-মানসিকতায়ও তাদেরই প্রতিচ্ছবি ছিলেন।

একালের তালিবুল ইলম

হাকীমুল উম্মত হযরত থানভী রাহ. বর্তমান কালের তালিবুল ইলম (মাদরাসার ছাত্র)-এর উন্নত, দামী, জৌলুসপূর্ণ পোশাক ও তাদের আড়ম্বরপূর্ণ জীবন-যাপন দেখে খুবই আফসোস করতেন এবং বলতেন, তাদের এ ধরনের (অর্থাৎ, বিলাসী ও আড়ম্বরপূর্ণ) জীবন যাপন দেখে মনে হয় তাদের ইলমের হাওয়াও লাগেনি, যদি ইলম হাসিলের আগ্রহ থাকতো, তাহলে এ ধরনের হীন ও তুচ্ছ জিনিসের প্রতি তাদের মনযোগ হতো না, তারা এ সকল জিনিসের দিকে ফিরেও তাকাতো না।

ছাত্র-যামানায় থানভী রাহ.

মিরাঠের বিখ্যাত ধনাঢ্য ব্যক্তি জনাব শাইখ ইলাহী বখ্শ (হযরতের পিতা যার ম্যানেজার ছিলেন)-এর ভাই শাইখ হাফেজ আব্দুল করীম ছাহেব হযরতের ছাত্রাবস্থায় একবার দারুল উলূম দেওবন্দে তৎকালীন মুহতামিম জনাব মাওলানা রফী উদ্দীন ছাহেব রাহ.-এর সাথে সাক্ষাতের জন্য আসেন। তখন তাঁর থানভী রাহ.-এর সাথেও দেখা হয়। তিনি হযরত থানভী রাহ.-এর অনাড়ম্বর পোশাক-আশাক ও তালিবুল ইলম সুলভ সাদাসিধে অবস্থা (দুনিয়ার কোন কিছুর প্রতি কোনো আকর্ষণ নেই, কেবল পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত) দেখে বিস্মিত হয়ে ছিল না।

মোটকথা! হযরত হাকীমুল উম্মত থানভী রহ. ছাত্রাবস্থা থেকেই স্বীয় উস্তায ও আকাবির থেকে তাদের যোগ্যতা ও বরকত হাসিল করার জন্য সর্বদা ব্যকুল থাকতেন। দুনিয়ার অস্থায়ী আরাম-আয়েশ ও আড়ম্বরের প্রতি দৃষ্টিপাতই করতেন না। বরং সর্বদা ইলম হাসিলের এবং আকাবিরের অনুসরণের ধুন লেগে থাকতো। যার ফল এই হয়েছে যে, হযরত হাকীমুল উম্মত থানভী রাহ.-এর ব্যক্তিত্ব সারা দুনিয়ার মানুষের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। الحمد لله رب العالمين

(আশরাফুস সাওয়ানেহ, খন্ড ১, পৃ. ৩৮-৩৯)

 

শিক্ষাদান ও শিক্ষকতা

হযরত হাকীমুল উম্মত থানভী রাহ. দারুল উলূম দেওবন্দ থেকে ফারেগ হওয়ার পর, কানপুরে শিক্ষাদান কাজে নিয়োজিত হন। সাথে সাথে ওয়াজ-নসীহত, রচনা-সংকলন ও ফতোয়াদানের কাজও সুন্দরভাবে আঞ্জাম দিচ্ছিলেন। প্রায় চৌদ্দ বছর সেখানে এসকল কাজ করেছেন।

কানপুরে হযরতের দ্বীনী খেদমতের ব্যবস্থা এভাবে হয়েছিল যে, কানপুরের বিখ্যাত মাদরাসা ‘ফয়যে আম’ অত্র এলাকার সবচেয়ে প্রাচীন মাদরাসা ছিল। এ মাদরাসার প্রধান শিক্ষক ছিলেন সে সময়ের বিখ্যাত আলেম জনাব হযরত মাওলানা আহমদ হাসান ছাহেব রাহ.। তিনি কোনো কারণে মাদরাসা কর্তৃপক্ষের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে এ মাদরাসা ছেড়ে অন্যত্র গিয়ে ‘দারুল উলূম’ নামে ভিন্ন একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি যেহেতু ছাত্রদের খুবই প্রিয় ছিলেন, তাই তার স্থলে অন্য কেউ আসতে সাহস করছিল না। হযরত থানভী রাহ. এ ব্যাপারে কিছুই জানতেন না। যখন সেখান থেকে একজন উপযুক্ত শিক্ষক চাওয়া হল, তখন হযরত থানভী রাহ. স্বীয় উস্তাযগণের নির্দেশ ও পিতার অনুমতিক্রমে নিশ্চিন্ত মনে সেখানে গমন করলেন এবং পড়াতে আরম্ভ করলেন।

সে সময় হযরত থানভী রহ.-এর মাসিক সম্মানী ছিল মাত্র পঁচিশ টাকা। যদিও এ অংক সে সময়ের হিসেবে একেবারে কম ছিল না, কিন্তু হযরত থানভী রাহ.-এর যোগ্যতা ও তাঁর পিতার ধনাঢ্যতার বিচারে কিছুই ছিল না। এতদসত্ত্বেও হযরত থানভী রাহ. এ বেতন অত্যন্ত অধিক মনে করতেন। তিনি বলতেন, আমি ছাত্রাবস্থায় যখন ভবিষ্যত শিক্ষকতার বিষয়ে ভাবতাম, তখন মনে করতাম দশ টাকা মাসিক সম্মানীই আমার জীবন-জীবিকার জন্য যথেষ্ট। পাঁচ টাকা আমার ব্যক্তিগত খরচের জন্য। আর পাঁচ টাকা বাড়ীর খরচের জন্য। এটুকুই যথেষ্ট। এর অতিরিক্ত সম্মানীর দিকে আমার দৃষ্টিই যেত না। আমি নিজেকে এর অধিকের যোগ্যই মনে করতাম না।

হযরত হাকীমুল উম্মত থানভী রাহ. যদিও সে সময় একেবারে নওজোয়ান ছিলেন, কিন্তু কানপুরে গিয়ে খেদমত শুরু করার সামান্য কিছুদিনের মধ্যেই সেখানকার সকল শিক্ষক ও শহরবাসীর নিকট প্রসিদ্ধ হয়ে গেলেন এবং সকলের প্রিয়পাত্রও হয়ে গেলেন। এমনকি হযরত মাওলানা আহমাদ হাসান ছাহেব রাহ. (যার চলে যাওয়ার কারণে হযরত থানভী রাহ. তার স্থলে শিক্ষক হয়েছিলেন)ও খুবই মহববত করতেন এবং শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখতেন।

(আশরাফুস সাওয়ানেহ, খন্ড ১, পৃ. ৪০-৪১)

যিলক্বদ ১৪৩৫ – সেপ্টেম্বর ২০১৪

মাসিক আল কাউসার