হিলফুল ফুজুলে অংশগ্রহণ

হিলফুল ফুজুল

মুহাম্মদের বয়স যখন বিশ, তখন আরবে এক ভয়াবহ যুদ্ধা হয়; সে যুদ্ধের নাম ফিজার বা ফুজ্জার। এ যুদ্ধে যুবক মুহাম্মদেরও ক্ষীণ অংশগ্রহণ ছিলো। তিনি যুদ্ধে চাচাদের তির কুড়িয়ে দিতেন এবং তাদের সেবাযত্ন করতেন।

ফিজার যুদ্ধের নিষ্ঠুরতা ও ভয়াবহতা সুচিন্তাশীল ও সদিচ্ছাপরায়ণ আরববাসীগণকে দারুণভাবে বিচলিত করে তোলে। এ যুদ্ধে কত যে প্রাণহানি ঘটে, কত শিশু এতিম হয়, কত নারী বিধবা হয় এবং কত সম্পদ বিনষ্ট হয়, তার ইয়ত্তা করা যায় না। ভবিষ্যতে আরববাসীগণকে যাতে এ রকম অর্থহীন যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে ভয়াবহ ক্ষয়-ক্ষতির শিকার হতে না হয়, সেজন্য আরবের বিশিষ্ট গোত্রপতিগণ আব্দুল্লাহ বিন জুদয়ান তাইমির গৃহে একত্রিত হয়ে আল্লাহর নামে একটি অঙ্গীকারনামা সম্পাদনা করেন। আব্দুল্লাহ বিন জুদআন ছিলেন তৎকালীন মক্কার একজন অত্যন্ত ধনাঢ্য ব্যক্তি। অধিকন্তু, সততা, দানশীলতা এবং অতিথিপরায়ণতার জন্য সমগ্র আরবভূমিতে তাঁর বিশেষ প্রসিদ্ধি থাকার কারণে আবরবাসীগণের উপর তাঁর যথেষ্ট প্রভাবও ছিলো। এ প্রেক্ষিতেই তাঁর বাড়িতেই অঙ্গীকারনামা সম্পাদনের এ অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা হয়।

যে সকল গোত্র আলোচনার বৈঠকে অংশগ্রহণ করেন, তার মধ্যে প্রধান গোত্রগুলো হচ্ছে : বনু হাশিম, বনু মুত্তালিব, বনু আসাদ বিন আব্দুল উযযা, বনু যোহরা বিন কিলাব এবং বনু তামিম বিন মুররাহ। বৈঠকে একত্রিত হয়ে সকলে যাবতীয় অন্যায়, অনাচার এবং অর্থহীন যুদ্ধ-বিগ্রহের প্রতিকার সম্পর্কে আলাপ-আলোচনা করেন। তখনকার সময়ে নিয়ম ছিল গোত্রীয় কিংবা বংশীয় কোনো ব্যক্তি, আত্মীয়-স্বজন অথবা সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ কোনো ব্যক্তি শত অন্যায়-অনাচার করলেও সংশ্লি­ষ্ট সকলকে তাঁর সমর্থন করতেই হবে, তা সে যত বড় বা বীভৎস অন্যায় হোক না কেন। এ পরামর্শ-সভায় এটা স্থিরীকৃত হয় যে, এ জাতীয় নীতি হচ্ছে ভয়ংকর অন্যায়, অমানবিক ও অবমাননাকর। কাজেই, এ ধরণের জঘন্য নীতি আর কিছুতেই চলতে দেয়া যেতে পারে না। তাঁরা প্রতিজ্ঞা করলেন :

(ক) দেশের অশান্তি দূর করার জন্য আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করবো।

(খ) বিদেশি লোকজনের ধন-প্রাণ ও মান-সম্ভ্রম রক্ষা করার জন্য আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করবো।

(গ) দরিদ্র, দুর্বল ও অসহায় লোকদের সহায়তা-দানে আমরা কখনোই কুণ্ঠাবোধ করবো না।

(ঘ) অত্যাচারী ও অনাচারীর অন্যায়-অত্যাচার থেকে দুর্বল দেশবাসীদের রক্ষা করতে প্রাণপণ চেষ্টা করবো।

এটা ছিল অন্যায় ও অনাচারের বিরুদ্ধে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য অঙ্গীকারনামা। এজন্য এ অঙ্গীকারনামাভিত্তিক সেবা-সংঘের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘হিলফুল ফুজুল’ বা ‘হলফ-উল ফুজুল’।

অনেকে বলে থাকেন, হিলফুল ফুজুল নবি মুহাম্মদের তৈরি সেবা-সংঘ; এ ধারণাটি ভুল। তিনি এ সংঘ তৈরি করেননি, তিনি এ কল্যাণ-সংঘের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং পরবর্তীতেও এরকম কল্যাণের প্রতি অনুপ্রেরণা দিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘আজও যদি কোনো উৎপীড়িত ব্যক্তি বলে—‘হে ফুজুল অঙ্গীকারনামার ব্যক্তিবৃন্দ…’—আমি নিশ্চয়ই তার সে আহ্বানে সাড়া দেবো।’


নবীজি