খতমে নবুওয়্যাত সম্পর্কে আক্বীদা – মুফতী মনসূরুল হক (দা.বা)

তাওহীদ ও আখেরাতের পর ইসলামের মৌলিক আক্বীদা-বিশ্বাস যে সকল বিষয়ের উপর প্রতিষ্ঠিত তন্মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি আক্বীদা হলো আক্বীদায়ে খতমে নবুওয়্যাত। অর্থাৎ নবুওয়্যাত ও রিসালাতের পবিত্র ধারা সর্ব শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগমনের মাধ্যমে পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। কেউ তাঁর পরে নবী হবে না, কারো উপর ওহীও অবতীর্ণ হবে না। এমনকি কারো উপর এমন কোন ইলহামও হবে না যা দীনের ব্যাপারে হুজ্জাত (প্রমাণ স্বরূপ) হবে। ইসলামের এ আক্বীদাই ‘খতমে নবুওয়্যাত’ নামে প্রসিদ্ধ।

হুযূর সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যামানা থেকে এ পর্যন্ত গোটা উম্মত কোন ধরণের নূন্যতম বিবাদ ও মতানৈক্য ছাড়াই এই আক্বীদাকে ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসাবে মেনে আসছে। কুরআনে কারীমের বহু আয়াত এবং হুযূর সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অসংখ্য হাদীস এ ব্যাপারে সাক্ষ্য প্রদান করে। এ ব্যাপারটি অকাট্যভাবে প্রমাণিত ও সর্বজনস্বীকৃত।

উলামায়ে উম্মত এ বিষয়ে শক্ত হাতে কলম ধরেছেন এবং রচনা করেছেন বহু কিতাব। হযরত মওলানা মুফতী মুহাম্মাদ শফী রহ. উর্দু ভাষায় ‘খতমে নবুওয়্যাত’ নামে একটি প্রামাণ্য কিতাব রচনা করেছেন। তাতে তিনি অসংখ্য আয়াত, হাদীস ও আসারে সাহাবার আলোকে খতমে নবুওয়্যাতকে প্রমাণ করেছেন। সংক্ষিপ্ততার কারণে ঐ সমস্ত আয়াত ও হাদীস এখানে উল্লেখ করা হলো না।

তবে যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম খতমে নবুওয়্যাতের আক্বীদা সম্পর্কে অসংখ্য বার সতর্ক করার পাশাপাশি এ ভবিষ্যতবাণীও করে গেছেন যে,

لا تقوم الساعة حتى يبعث دجالون كذابون قريبا من ثلاثين كلهم يزعم أنه رسول الله
অর্থ: কিয়ামত ততক্ষণ পর্যন্ত কায়েম হবে না যতক্ষণ না ত্রিশের কাছাকাছি দাজ্জাল ও কাযযাব পয়দা হবে, যাদের মধ্যে প্রত্যেকেই দাবি করবে, সে আল্লাহর রাসূল।

অন্যত্র আছে, إنه سيكون فى أمتى كذابون ثلاثون كلهم يزعم أنه نبي وأنا خاتم النبيين لا نبي بعدي
অর্থ: অদূর ভবিষ্যতে আমার উম্মতের মধ্যে ত্রিশ জন মিথ্যা দাবিদার বের হবে, প্রত্যেকেই এই দাবি করবে যে সে নবী, অথচ আমি সর্ব শেষ নবী, আমার পরে আর কোনো নবী আসবে না।

তিনি আরো বলেন,
إن مثلي ومثل الأنبياء من قبلي كمثل رجل بنى بيتا فأحسنه وأجمله، إلا موضع لبنة من زاوية، فجعل الناس يطوفون به، ويعجبون له، ويقولون هلا وضعت هذه اللبنة؟ قال فأنا اللبنة وأنا خاتم النبيين
অর্থ: আমি এবং আমার পূর্ববর্তী নবীগণের অবস্থা এরূপ যে, যেন এক ব্যক্তি একটি ভবন নির্মাণ করলো, এটাকে সুশোভিত ও সুসজ্জিত করলো, কিন্তু এক কোণায় একটি ইটের জায়গা খালি রেখে দিলো। লোকজন তার চারপাশে ঘুরে বিস্ময়ের সাথে বলতে লাগলো, এ ইটটি লাগানো হলো না কেন? (নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন,) আমিই সে ইট, আর আমিই সর্বশেষ নবী।

বিষয়টি এত স্পর্শকাতর যে, নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ ব্যাপারে ভুল বোঝার কোন সুযোগই রাখেননি। যেমন যুদ্ধে যাওয়ার সময় হযরত আলী রাযি. কে মদীনায় নিজের স্থলাভিষিক্ত করে যান। জিহাদে যেতে না পেরে হযরত আলী দুঃখিত হলেন, তখন তাঁকে সান্তনা দেয়ার জন্য নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন,
أنت مني بمنزلة هارون من موسى، إلا أنه لا نبي بعدي
অর্থাৎ তুমি আমার থেকে এমন, যেমন হযরত হারুন আ. হযরত মূসা আ. থেকে; তবে আমার পরে কোন নবী আসবে না।

দেখুন, এখানে হযরত আলী রাযি. কে হযরত হারুন আ. এর সাথে তুলনা করায় কেউ কেউ ভুল বুঝতে পারে যে, হযরত হারুন আ. যেহেতু নবী ছিলেন তাহলে আলী রাযি.-ও নবী। এ ভুলের সুযোগ না দেয়ার জন্য নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাথে সাথে বললেন, ‘তবে আমার পরে কোন নবী আসবে না’।

উক্ত হাদীসসমূহে হুযূর সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর আগমনের পর যারা নবুওয়্যাতের দাবি করবে তাদের জন্য ‘দাজ্জাল’ শব্দ ব্যবহার করেছেন। যার শাব্দিক অর্থ হলো, চরম ধোঁকাবাজ।

এ শব্দ ব্যবহার করে নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মতকে কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন যে, আমার পর যারা নবুওয়্যাতের দাবি করবে তারা স্পষ্ট ভাষায় ইসলামের বিরুদ্ধাচরণ না করে কূটকৌশলে কাজ নিবে। মুসলমানের রূপে দিয়ে নবুওয়্যাতের দাবি করবে এবং এই উদ্দেশ্যে উম্মতের স্বীকৃত আক্বীদাসমূহে এমনভাবে কাটছাঁট করবে যে বহু লোকই ধোঁকায় পড়ে যাবে। এই চরম ধোঁকা থেকে বাঁচার জন্য উম্মতের একথা স্মরণ থাকা উচিত, আমি ‘খাতামুন নাবিয়্যীন’ অর্থাৎ আমার পর কেউ নবী হবে না।

ইতিহাসের পাতায় তাকালে আমরা দেখতে পাই, যুগে যুগে যারাই নবুওয়্যাতের দাবিদার হয়েছে তারা নিজেকে মুসলমান রূপে প্রকাশ করে স্বীয় দাবি প্রচারের চেষ্টা করেছে। কিন্তু উম্মতে মুহাম্মাদী এ ব্যাপারে কুরআন হাদীসের দিক নির্দেশনা প্রাপ্ত হওয়ায় যখনই নবুওয়্যাতের কোন ভণ্ড দাবিদার আত্মপ্রকাশ করেছে তাকে কাফের সাব্যস্ত করেছে এবং ইসলামের গণ্ডি থেকে বহিষ্কার করেছে।

নববী যুগ থেকে যখনই কোন ইসলামী রাষ্ট্রে বা ইসলামী আদালতে এ ধরণের মামলা উপস্থিত হয়েছে তখনই বিচারকগণ তার দাবির স্বপক্ষে কোনো প্রকার দলীল-প্রমাণ তলব না করে তার ব্যাপারে কাফের হওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। যেমন, মুসাইলামা কাযযাব, আসওয়াদ আনাসী, তুলাইহা, সাজাহ, হারেস। সাহাবায়ে কেরাম তাদের কুফরীর ফায়সালা দেয়ার পূর্বে কখনো নবুওয়্যাতের দাবির ব্যাপারে তাদের থেকে কোন প্রকার দলীলও তলব করেননি। যখনই কারো পক্ষ থেকে নবুওয়্যাতের দাবির স্বপক্ষে প্রমাণ পাওয়া গেছে তখনই সর্ব সম্মতিক্রমে তাকে কাফের ঘোষণা দেয়া হয়েছে।

এর কারণ হলো, খতমে নবুওয়্যাতের আক্বীদা এতটাই স্পষ্ট ও সর্বজন স্বীকৃত যে, এর খেলাফ যুক্তি-তর্ক সব প্রতারণারই শামিল। এ সম্পর্কে হুযূর সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মতকে পূর্বেই অবগত করে গেছেন। যদি এ ধরণের কোন ব্য সামান্য অবকাশ দেয়া হয় তাহলে তাওহীদ-আখিরাত কোন আক্বীদাই নিরাপদ থাকবে না।

অতএব কেউ যদি খতমে নবুওয়্যাতের এই ব্যাখ্যা দেয়া আরম্ভ করে যে, ‘তাশরীঈ’ নবুওয়্যাত আসবে না। তবে ‘গায়রে তাশরীঈ’ নবুওয়্যাত এখনও আসতে পারে, তো তার এ কথা এমনই হবে যেমন কেউ এই দাবি করলো যে, তাওহীদের আক্বীদা অনুযায়ী তো বড় খোদা শুধু এক সত্তাই, কিন্তু ছোট ছোট মা’বূদ অনেক হতে পারে এবং তারা সকলেই উপাসনার উপযুক্ত। (নাঊযুবিল্লাহ)

যদি এ ধরণের অপব্যাখ্যার বিন্দুমাত্র সুযোগ দেয়া হয় তাহলে এর অর্থ দাঁড়াবে যে, ইসলামে স্বতন্ত্র কোন আক্বীদা বিশ্বাস, কোন চিন্তা চেতনা, কোন বিধান এবং কোন চারিত্রিক মাপকাঠি নির্ধারিত নেই। বরং এটা এমন একটা পোশাক যা দ্বারা পৃথিবীর নিকৃষ্ট থেকে নিকৃষ্টতম বিশ্বাস পোষণকারী ব্যক্তিও নিজেকে আবৃত করতে পারে। (নাঊযুবিল্লাহ)

তাই মুসলিম উম্মাহ কুরআন ও সুন্নাতের মুতাওয়াতের ইরশাদ অনুযায়ী স্বীয় রাষ্ট্রীয় বিধান, আদালতি সিদ্ধান্ত এবং ইজতিমায়ী ফাতাওয়ার ক্ষেত্রে এই নীতির উপর আমল করে আসছে যে, হুযূর সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের পর যে কেউ নবুওয়্যাতের দাবি করবে, তাকে এবং তার সকল অনুসারীদেরকে কাফের সাব্যস্ত করা হবে।

সারকথা হলো, ‘খতমে নবুওয়্যাত’ এর আক্বীদা অত্যন্ত স্পর্শকাতর। এই আক্বীদায় বিশ্বাসী হওয়া প্রত্যেক মুসলমানের উপর ফরয। অস্বীকারকারী কাফের। কেননা নতুন কোন নবী আগমনের যে প্রয়োজন বা প্রেক্ষাপট থাকে, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের পর সেই প্রয়োজন বা প্রেক্ষাপট আর দেখা দেয়নি; দেখা দিবেও না।

পূর্বে এক নবীর পর আরেক নবী আগমনের প্রয়োজন এ কারণেই দেখা দিয়েছে যে, পূর্বের নবী সাময়িক ছিলেন বা বিশেষ কোন ভূখন্ডের জন্য প্রেরিত হয়েছিলেন বা নবী তার সাহায্যার্থে আল্লাহর কাছে কোন নবী চেয়ে নিয়েছিলেন অথবা পূর্ববর্তী নবীর শিক্ষা যদি বিকৃতি বা পরিবর্তনের শিকার হয়েছিলো কিংবা পূর্ববর্তী নবীর শিক্ষা অপূর্ণ ছিলো। আমাদের শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগমনের পর এ ধরণের কোন প্রয়োজন দেখা দেয়নি; দিবেও না। আল্লাহ তা‘আলার ঘোষণা:
  الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا
অর্থ: আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং তোমাদের প্রতি আমার নেয়ামতকে পূর্ণ করলাম আর দীন হিসাবে তোমাদের জন্য ইসলামকে মনোনীত করলাম।

আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে সহীহ আক্বীদা পোষণ করার তৌফিক দান করুন। আমীন।