ইসলামে জিহাদের নির্দেশ

কী ভয়ঙ্কর আর মানবেতর জীবনের মুখোমুখি হয়ে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবাদের পক্ষে হিজরত অনিবার্য হয়ে উঠেছিলো অত্যাচার ও নির্যাতনক্লিষ্ট মাক্কি জীবন তার সাক্ষী। মক্কা থেকে মুসলিমদের বিতাড়িত করেই যে মক্কার কাফেররা স্থির হয়েছিলো, তা নয়; তারা বরং তাদের নতুন বাসস্থান মদিনাকেও নরক করে তোলার হীন ষড়যন্ত্রে দিন-রাত নিজেদের ব্যস্ত করে তুলেছিলো। সেই ব্যস্ততার অংশ হিসেবে এবং মদিনাকেও মুসলিমদের অবাসযোগ্য ভূমি হিসেবে পরিণত করতে তারা আনসারদের নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাইকে মোক্ষম টোপ হিসেবে বাগে পেলো, যে কিনা মদিনায় নবীজির আগমন ও নবীজির প্রতি আনসারদের স্বতস্ফূর্ত আনুগত্যকে বাঁকা নজরে দেখছিলো এবং নিজ নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের জন্য বিরাট বাধা মনে করছিলো;—এই কুটিল ও বাঁকা চিন্তার লোকটিকে ফুসলিয়ে কুরাইশরা চিঠি লিখলো :‘তোমরা কিছু বিপথগামী লোককে ইয়াসরিবে জায়গা দিয়েছো। হয় তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তাদেরকে তোমাদের দেশছাড়া করো, নইলে আমরা তোমাদের ধ্বংস নিয়ে আসছি; তোমাদের মহিলাদের মানহানি করে আমরা ফিরবো।’
কুরাইশদের এই চিঠি আবদুল্লাহ ইবনে উবাইকে ভালো-রকম উসকে ধরলো। সে তার মুশরিক বন্ধুদের একত্র করে ফেললো; কিন্তু খুব বেশি সুবিধা সে করতে পারলো না। বিদ্রোহ করার আগেই নবীজির কাছে এ সংবাদ পৌঁছে গেলে নবীজি এ ব্যাপারে তাদের সাবধান করে বলেন,‘এই পাঁকে পড়ে তোমরা নিজেদের যে পরিমাণ ক্ষতির মুখে ঠেলছো, কুরাইশরা তোমাদের সে পরিমাণ ক্ষতি করতে পারবে না।’ নবীজির সাবধানবাণীতে তাদের মনের হীন সুপ্ত বাসনা গুটিয়ে গেলো।তাই বলে কাফেররা মুসলিমদের ক্ষতিসাধনের কোনো রাস্তাই ছেড়ে বসতে রাজি ছিলো না।বাহ্যত এই উদ্যমে ভাটা পড়লেও কুরাইশরা তাদের সাথে গোপন যোগাযোগ চালিয়ে গেলো।
এদিকে কুরাইশরা নিয়ম করে মুসলিমদের কাবায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দিলো আর সরাসরি হুমকি দিলো যে,‘তোমরা কি ভেবেছো মদিনায় পালিয়ে তোমরা বেঁচে গেছো?—ইয়াসরিবে চড়াও হয়ে তোমাদের ধ্বংস করার ক্ষমতা আমরা রাখি।’ তাদের এই হুমকি শুধু হুমকিতেই সীমাবদ্ধ ছিলো না, এই ব্যাপারে তাদের গোপন তৎপরতাও জারি ছিলো।
মদিনায় আবাস নেওয়ার পরও পরিস্থিতি এত বিপজ্জনক রূপে যায় যে, নবীজি হয় রাত জেগে কাটাতেন বা সাহাবাদের প্রহরাধীনে থাকতেন।এ ভয়ভীতি ও বিপজ্জনক অবস্থা মদিনায় মুসলিমদের অস্তিত্বের জন্য একটি মারাত্মক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো এবং এর দ্বারা এটাও সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছিলো যে, কুরাইশরা কোনোক্রমেই তাদের বিদ্বেষপরায়ণতা ও একগুঁয়েমি পরিহার করতে প্রস্তুত নয়। এসব অবস্থা এবং নানারৈখিক বিবেচনার পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা মুসলিমগণকে যুদ্ধের অনুমতি প্রদান করেন, কিন্তু তখন পর্যন্ত মুসলিমদের উপর যুদ্ধ ফরজ হয়নি। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা আয়াত নাজিল করলেন—
তরজমা :যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হয়, তাদেরকে যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হলো;কেননা, তাদের প্রতি অত্যাচার করা হয়েছে। আল্লাহ তাদেরকে সাহায্য করতে অবশ্যই সক্ষম। ( সূরা হাজ ২২ : ৩৯) ‏‏
তারপর এ ধরনের আরও বহু আয়াত অবতীর্ণ হয়; সেগুলোতে বলে দেওয়া হয় যে, যুদ্ধের এ অনুমতি যুদ্ধ হিসেবে নয়, বরং এর উদ্দেশ্য হচ্ছে বাতিলের বিলোপ সাধন এবং আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠিতকরণ—
তরজমা :(এরা হলো তাঁরা) যাঁদেরকে আমি জমিনে প্রতিষ্ঠিত করলে তাঁরা সালাত প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত প্রদান করে, সৎ কাজের আদেশ দেয় ও মন্দ কাজে নিষেধ করে;সকল কাজের শেষ পরিণাম (ও সিদ্ধান্ত) আল্লাহর হাতে নিবদ্ধ। (আল-হাজ্জ ২২ : ৪১) ‏‏
যুদ্ধের অনুমতি তো নাজিল হলেও এই অনুমতি শুধু কুরাইশদের সাথেই সীমাবদ্ধ ছিলো। তারপর বিভিন্ন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে যুদ্ধের অনুমতির বিস্তৃতি ঘটে। এমনকি তা ওয়াজিবের স্তরে উপনীত হয়। তখন এ নির্দেশ কুরাইশ ব্যতীত অন্যাদের বেলাতেও প্রযোজ্য হয়।এসব স্তর বা পর্যায় সম্পর্কে আলোকপাত করা প্রয়োজন: ‏‏
১. মক্কার কুরাইশ মুশরিকদেরকে যুদ্ধরত গণ্য করা। কেননা তারাই প্রথম শত্রুতা আরম্ভ করে। ফলে, তাদের সাথে যুদ্ধ করা মুসলমানদের পক্ষে আবশ্যক হয়ে পড়ে। আর সাথে সাথে মক্কার অন্যান্য মুশরিক ব্যতীত কেবল তাদের ধন-সম্পদকে বাজেয়াপ্ত করাও জরুরি হয়ে পড়ে। ‏‏
২. ওদের সাথে যুদ্ধ করা, যারা আরবের সকল মুশরিক কুরাইশদের সাথে মিলিত ও একত্রিত হয়। অনুরূপ কুরাইশ ব্যতীত অন্যান্য গোষ্ঠী, যারা পৃথক পৃথকভাবে মুসলমানদের সাথে শত্রুতা পোষণ করে। ‏‏
৩. সেসব ইহুদিদের সাথে যুদ্ধ করা, যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সন্ধি ও প্রতিশ্রুতি থাকা সত্ত্বেও খেয়ানত করেছে এবং মুশরিকদের সাথে জোটবদ্ধ হয়েছে ও অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছে। ‏‏
৪. আহলে কিতাবদের মধ্যে যারা মুসলমানদের সাথে শত্রুতা পোষণ করে, তাদের সাথে যুদ্ধ করা,—যেমন, খ্রিস্টান সম্প্রদায়; যতক্ষণ তারা বিনীত হয়ে জিযিয়া-কর না দেয়। ‏‏
৫. মুশরিক, ইহুদি, খ্রিস্টান নির্বিশেষে যারাই ইসলাম গ্রহণ করবে, তাদের সাথে যুদ্ধ করা থেকে বিরত থাকা। ইসলামের হদ ব্যতীত তাকে কিছু করা যাবেনা। তার বাকি হিসাব আল্লাহর হাতে। ‏‏
মোটকথা,আত্মরক্ষামূলক ও আক্রমণাত্মক—উভয় প্রকার জিহাদেরই উদ্দেশ্য ছিলো, শুধু উত্তম চরিত্রের ব্যাপক প্রসার ঘটানো, ইসলামের নিরাপত্তাবিধান আর ইসলামের প্রচারের পথে যেসব প্রতিবন্ধকতা আরোপ করা হতো, সেগুলোর আপসারণ।


তথ্যসূত্র :আর-রাহিকুল মাখতুম, সফিউর রহমানমোবারকপুরি; সিরাতে খাতামুল আম্বিয়া, মুফতি শফি।