প্রারম্ভিক আলোচনা

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক খলীফা মনোনীত না করার রহস্য

বাযযার (রহঃ) তার মুসনাদ গ্রম্থে হযরত হুজাইফা (রাঃ) এর বরাত দিয়ে বলেছেন যে, সাহাবাগণ জিজ্ঞেস করলেন, “ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আপনি আমাদের জন্য কাউকে খলীফা মনোনীত করছেন না কেন ?” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “আমি যদি কাউকে তোমাদের জন্য খলীফা মনোনীত করি, আর তোমরা আমার খলীফার অবাধ্য হও, তবে তোমাদের উপর আল্লাহ’র আযাব অবতীর্ণ হবে।” হাদিসটি হাকিম মুসতাদরাক গ্রন্থেও বর্ণনা করেছেন, কিন্তু এ হাদিসটি দুর্বল।

ইমাম বুখারি (রহঃ) ও ইমাম মুসলিম (রহঃ) একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন যে, উমার (রাঃ) এর ঘাতক যখন বর্শা দিয়ে আঘাত করে, তখন লোকেরা বললো, “আপনি কাউকে খলীফা মনোনীত করে যান।” তিনি বললেন, “যিনি আমার চেয়ে মহান, অর্থাৎ আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ), তিনি খলীফা মনোনীত করেছেন। তবে আমি তোমাদের খলীফা মনোনীত না করে চলে যাচ্ছি, কারন তিনি এভাবেই চলে গেছেন – যিনি আমার চেয়ে মহান, অর্থাৎ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।”

দালায়েলুন নবুওয়ত গ্রন্থে আমর বিন সুফিয়ানের বরাত দিয়ে বায়হাকি (রহঃ) আর ইমাম আহমাদ (রহঃ) বর্ণনা করেন, আলী (রাঃ) জামাল যুদ্ধ জয়ের পর ভাষণ দেন। এতে তিনি বলেন, “হে জনতা, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খিলাফতের ব্যাপারে আমাদের থেকে কোন প্রতিশ্রুতি নেননি, বরং আমরা নিজেরাই হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) কে খলীফা মনোনীত করেছিলাম। তিনি খুব ভালোভাবেই খিলাফতের কাজ করেছেন আর নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। এরপর নিজের কাছে মঙ্গল ও সঙ্গত মনে করে উমর (রাঃ) কে এ কাজের জন্য মনোনীত করে যান। তিনিও অত্যন্ত দক্ষতার সাথে খিলাফতের দায়িত্ব পালন করেছেন আর দ্বীন ইসলামের ভিত্তিকে শক্ত স্থানে স্থাপন করেছেন। এরপর অনেকেই দুনিয়ার মোহে পড়ার প্রেক্ষিতে আল্লাহ যা চান তাই ফায়সালা করেছেন।”

হাকিম (রহঃ) তার মুসতাদরাক গ্রন্থে আর বায়হাকি দালায়েল গ্রন্থে এ বিষয়ে উল্লেখ করেছেন যে, লোকেরা হযরত আলীকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কি কাউকে খলীফা মনোনীত করবেন ?” তিনি বললেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন খলীফা মনোনীত করে যাননি, তখন আমি তা কিভাবে করবো ? আমার পর তোমরা খলীফা নির্বাচিত করে নিবে, যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পর খলীফা মনোনীত হয়েছিলো।”

যাহাবী বলেন, শিয়াদের মধ্যে এ কথা প্রসিদ্ধ যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আলী (রাঃ) এর খিলাফতের জন্য প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন, এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা। কারন হাযীল বিন শারজীল বলেন, এটা কি করে সম্ভব যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আলীর খিলাফতের জন্য প্রতিশ্রুতি নিবেন আর হযরত আবু বকর (রাঃ) খলীফা হবেন ! হযরত আবু বকর তো চেয়েছিলেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যদি কারো জন্য খিলাফতের প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেন, তবে তিনি তার অধীনস্থ হবেন। (বায়হাকী)

ইবনে সা’দ (রহঃ) হাসান (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, আলী (রাঃ) বলেছেন, “নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মৃত্যুর পর আমরা চিন্তা করে বের করলাম যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অনুপস্থিতিতে আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) কে ইমাম বানিয়েছেন। সুতরাং, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাকে আমাদের দ্বীনের জন্য গ্রহণ করেছেন, তিনি দুনিয়ার জন্য যথেষ্ট।”

ইমাম বুখারি (রহঃ) তার ইতিহাস গ্রন্থে সাফীনা (রাঃ) এর এ বর্ণনাটি লিখেছেন – রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আবু বকর (রাঃ), হযরত উমর (রাঃ) আর হযরত উসমান (রাঃ) এর ব্যাপারে বলেছেন, “আমার পর এরা খলীফা হবেন।” ইমাম বুখারি (রহঃ) বলেন, এ হাদিসটি বিশুদ্ধ নয়, কারন বিশুদ্ধ হাদিস দিয়ে প্রমাণিত যে, হযরত উমর (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ) ও হযরত উসমান (রাঃ) নিজেরাই বলেছেন, নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাউকে খলীফা মনোনীত করেননি।

ইমাম হাব্বান উপরোক্ত হাদিসটি আবুল আলী ও কয়েকজন বর্ণনাকারী থেকে এভাবে বর্ণনা করেছেন যে, নবীয়ে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপনের সময় প্রথমে পাথর নিজের হাতে স্থাপনের পর আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) কে বললেন, “তোমার পাথর আমার পাথরের পাশে রাখো।” এরপর হযরত উমরকে হযরত আবু বকরের পাথরের পাশে পাথর রাখতে বললেন। এরপর হযরত উসমানকে হযরত উমরের পাথরের পাশে পাথর রাখতে বললেন। এরপর বললেন, “আমার পর এরাই হবেন খলীফা।”

আবু যর (রাঃ) বলেছেন, এ হাদিসের সনদে কোন ত্রুটি নেই। উপরন্তু, হাকেম তার মুসতাদরাক গ্রন্থে এমনটাই উল্লেখ করেছেন। বায়হাকি দালাইল গ্রন্থে এ হাদিসকে সহিহ বলেছেন। গ্রন্থকার বলেছেন, এ হাদিস এবং হযরত উমর (রাঃ) ও হযরত আলী (রাঃ) এর কথার মধ্যে কোন সংঘর্ষ নেই। কারন তাদের উদ্দেশ্য ও দাবী হলো, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মৃত্যুর সময় খিলাফত বিষয়ক কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশ প্রদান করেননি আর মৃত্যুর আগে যে সকল ইশারা তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) করেছিলেন, আমার সুন্নত ও আমার খোলাফায়ে রাশেদার সুন্নতের উপর আমল করবে।

হাকেম (রহঃ) আরবায ইবনে সারিয়া (রাঃ) এর বর্ণনায় এ হাদিস বর্ণনা করেছেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আমার পর আবু বকর আর উমরের আনুগত্য করবে।” এছাড়াও অপর দুটো হাদিস, যা দিয়ে খিলাফতের ইশারা বের হয়।

 

খিলাফত কুরাইশদের জন্য

আবু দাউদ তায়ালাসী তার মুসনাদ গ্রন্থে আবু বারযাহ’র বরাত দিয়ে বর্ণনা করেন, খিলাফত কুরাইশদের জন্য মানানসই। তারা ইনসাফপূর্ণ বিচারকারী, প্রতিশ্রুতি রক্ষাকারী ও মেহেরবান। এ বর্ণনাটি তাবারানীও বর্ণনা করেছেন।

তিরিমিযী (রহঃ) আবু হুরায়রা (রাঃ) এর বরাত দিয়ে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “প্রশাসন কুরাইশদের, বিচার বিভাগ আনসারদের এবং আযাদ হাবশীদের অধিকারে থাকা উচিত।” এ হাদিসের সকল সনদ সহিহ।

ইমাম আহমাদ (রহঃ) তার মুসনাদ গ্রন্থে হাকিম ইবনে নাফি আর উতবা ইবনে আব্দুল্লাহ’র বর্ণনা নকল করে লিখেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “খিলাফত কুরাইশদের, বিচারকাজ আনসারদের আর আহবানের দায়িত্ব হাবশীদের।”

বাযযার (রহঃ) হযরত আলী (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন, খলীফাগণ কুরাইশদের মধ্য থেকে হবেন। এদের মধ্যে নেককারগণ নেককারগণের আমীর আর বদকাররা বদকারদের আমীর।

 

প্রথম পরিচ্ছেদ

ইমাম আহমাদ (রহঃ) বলেছেন যে হযরত সাফিনাহ (রাঃ) বলেছেন, “আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি যে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘খিলাফত মাত্র ত্রিশ বছর টিকবে। এরপর বাদশাহী প্রথা এসে যাবে।” আসহাবে সুনান এটি বর্ণনা করেছেন।

ওলামাগণ বলেন, তোমাদের দ্বীন ইসলাম প্রথমে নবুওয়ত ও রহমত দিয়ে শুরু হয়। এরপর খিলাফত ও রহমত এসে যায়, আর তারপর বাদশাহী ও অত্যাচারের প্রাদুর্ভাব ঘটে।

আবদুল্লাহ বিন আহমদ বলেন, জাবির বিন সামুরা (রাঃ) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন যে, কুরাইশদের বারোজন খলীফা অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত ইসলাম সবসময় জয়যুক্ত থাকবে। এটি ইমাম বুখারী আর ইমাম মুসলিম (রহঃ) বর্ণনা করেছেন। এ হাদিসটি কয়েকভাবে বর্ণিত হয়েছে। ‘ইসলামের কাজ অটুট থাকবে’, ‘ইসলামের কাজ অব্যাহত থাকবে’ – এ দুটো পদ্ধতি ইমাম আহমাদ কর্তৃক বর্ণিত।

ইমাম মুসলিম (রহঃ) এ হাদিসটি এভাবে বর্ণনা করেছেন, “বারোজন শাসক অতিবাহিত হওয়া পর্যন্ত মুসলমানদের কাজ অব্যাহত থাকবে।” তিনি বর্ণনাটি এভাবেও বর্ণনা করেছেন, বারোজন খলীফা না আসা পর্যন্ত সমাজে ইসলাম ছাড়া অন্য কিছু কার্যকর হবে না। উপরন্তু ইসলাম শক্ত ও সংরক্ষিত থাকবে বারোজন খলীফা পর্যন্ত। বাযযার এভাবে বর্ণনা করেছেন, (রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন) আমার বারোজন খলীফা অতিবাহিত হওয়া পর্যন্ত।

এ বর্ণনাটি আবু দাউদ একটু বৃদ্ধি করেছেন এভাবে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘরে এলে কুরাইশরা তার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের) কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো, বারোজন খলীফার পর কি হবে ? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, এরপর হত্যাযজ্ঞ ও বিশৃঙ্খলা দেখা দিবে। এক বর্ণনায় রয়েছে, উম্মাহ’র ইজমাকৃত বারোজন খলীফা পর্যন্ত এ দ্বীন সর্বদা অটুট থাকবে। এটি ইমাম আহমাদের রেওয়ায়েত।

হাসান সূত্রে বাযযার বর্ণনা করেন, ইবনে মাসউদ (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করা হল, কতজন খলীফা এ উম্মতকে শাসন করবে ? ইবনে মাসউদ (রাঃ) বললেন, “একদিন আমরাও নবীয়ে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এ ধরণের প্রশ্ন করেছিলাম। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছিলেন, বনি ইস্রাইলদের অনুরূপ বারোজন।”

কাযী আয়ায বলেন, উক্ত হাদিস আর সমার্থ হাদিসে উল্লেখিত বারোজন খলীফা থেকে সম্ভবত উদ্দেশ্য হলো, এ বারোজন খলীফা খিলাফতের অপ্রতিদ্বন্দ্বিতা আর ইসলামের শৌর্য-বীর্যকালে আসবেন। আর তাদের ব্যাপারে উম্মতের ইজমা (ঐক্যমত্য) থাকবে। কারন দুর্ভাবনার যুগ উমাইয়া বংশের ওয়ালীদ বিন ইয়াযিদের শাসনামল থেকে শুরু হয়, আর তা আব্বাসিয়া খিলাফত পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। আব্বাসিয়াদের প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বনু উমাইয়ার মূলোচ্ছেদ হয়।

শায়খুল ইসলাম ইবনে হাজার (রহঃ) বুখারি শরীফের ব্যাখ্যা গ্রন্থে কাযি আয়াযের সূত্র ধরে লিখেছেন, এ হাদিসের ব্যাপারে কাযি আয়াযের অভিমতটি খুবই চমৎকার। কারন কিছু বিশুদ্ধ হাদিস এ অভিমতকে সমর্থন করে যে, সমস্ত লোক খলীফার ব্যাপারে ঐক্যমত্য পোষণ করে। এই ঐক্যমত্য বা ইজমার অর্থ হলো, লোকেরা বাইয়াতের ব্যাপারে অনুগত আর হযরত আবু বকর (রাঃ), হজরত উমর (রাঃ), হজরত উসমান (রাঃ) ও হযরত আলি (রাঃ) এর যুগের মতো কেউ বাইয়াতের ব্যাপারে বাহানা করবে না।

সিফফিনের বিবাদের সময় দুই জন প্রশাসকের আবির্ভাব ঘটে। সেদিন মুয়াবিয়া (রাঃ) খলীফা হোন আর লোকেরা ইমাম হাসান (রাঃ) এর সাথে সন্ধি করার পর আমীর মুয়াবিয়া (রাঃ) এর ব্যাপারে ইজমা তথা ঐক্যমত্যে পৌঁছান। এরপর ইয়াযিদের বিষয়েও ইজমা হয় আর ইমাম হুসাইনের ব্যাপারে ঐক্যমত্য হয়নি, বরং তিনি আগেই শহীদ হোন। ইয়াযিদের মৃত্যুর পর মতানৈক্য দেখা দেয় আর ইবনে যুবাইরের হত্যার পর আবদুল মালিক বিন মারওয়ানের ব্যাপারে ইজমা হয়। আবদুল মালিক বিন মারওয়ানের পর তার চার পুত্র ওয়ালিদ, সুলাইমান, ইয়াযিদ আর হিশামের ব্যাপারে ইজমা হয়। সুলাইমান আর ইয়াযিদের মধ্যবর্তীতে উমর বিন আবদুল আযিযের বিষয়েও ইজমা হয়েছিলো। এ হিসাব মোতাবেক খুলাফায়ে রাশিদা ছাড়া সাতজন খলীফা হয়। আর এতে মোট খলীফার সংখ্যা দাঁড়ায় এগারো জন। বারোতম খলীফা ওয়ালিদ বিন ইয়াযিদ বিন আবদুল মালিক। তার চাচা হিশামের মৃত্যুর পর তার ব্যাপারে ইজমা হয়। চার বছর পর লোকেরা তার প্রতি অনাস্থা পোষণ করে আর তাকে হত্যা করে। এতে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় আর সময় খুবই দ্রুত পাল্টে যায়। এরপর কোন খলীফা মনোনীত করার ব্যাপারে লোকদের আর কোন ইজমা নেই, কারন ইয়াযিদ বিন ওয়ালিদ তার চাচাতো ভাই ওয়ালিদ বিন ইয়াযিদের বিরুদ্ধাচরণ করেছিলেন। তিনি (ইয়াযিদ বিন ওয়ালিদ) অল্প কিছুদিন জীবিত ছিলেন। তার পিতার চাচার ছেলে মারওয়ান বিন মুহাম্মাদ বিন মারওয়ান তার বিরুদ্ধে জয়লাভ করেন। ইয়াযিদের পরলোক গমনের পর তার ভাই ইব্রাহীম বাদশাহী হাতে নেন। কিন্তু মারওয়ান বিন মুহাম্মাদ বিন মারওয়ান ইব্রাহীমকে হত্যা করেন। এরপর বনু আব্বাসিয়ার হাতে তার পতন হয় আর তারা তাকে হত্যা করে।

আব্বাসিয়া বংশের প্রথম খলীফা হলেন সাফফাহ। তিনি দীর্ঘ সময় রাজদণ্ড ধারণ করেছিলেন না। তার পর তার ভাই মনসুর খিলাফতের দায়িত্ব নেন। তিনি দীর্ঘ সময় রাজ ক্ষমতা আঁকড়ে থাকেন। কিন্তু বনু উমাইয়া স্পেনে সংগঠিত হওয়ার কারণে পাশ্চাত্যের ভূখণ্ড তার শাসনামলে তার হাতছাড়া হয়ে যায়। বনু আব্বাসিয়া নিজেদের রাজত্বকে খিলাফত উপাধিতে ভূষিত করে। তাদের সময় অনেক ভ্রষ্টাচারের প্রবর্তন ঘটে আর নামেমাত্র খিলাফত থাকে। পক্ষান্তরে, আবদুল মালিক বিন মারওয়ানের যুগে মুসলমানগণ পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত বিজয় অর্জন করেছিলো। খলীফার নামে খুৎবা পাঠ করা হতো। খলীফার নির্দেশ ছাড়া কোন শহরে কিছু হতো না। স্পেন কেন্দ্রীয় সরকার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া, সেখানে নামমাত্র খলীফাদের দুর্বল শাসন আর তার সাথে মিসরে উবায়দীদের খিলাফতের প্রতি আহবান – এ সবই বাগদাদ থেকে খিলাফতের কর্মকাণ্ড চলে যাওয়ার ফল। বিশাল মুসলিম সাম্রাজ্যের সর্বত্রই খিলাফত নিয়ে বিবাদ – সে একই কারন পঞ্চম শতাব্দীতে স্পেনে ছয়জন খলীফা দাবী করেছেন।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন, বারোজন খলীফার পর ফিতনা ও বিশৃঙ্খলা দেখা দিবে। বস্তুত তাই হল। অন্যায় হত্যাযজ্ঞ চললো আর তা দীর্ঘস্থায়ী হলো। দিন দিন তা বৃদ্ধিও পেতে থাকলো। তারা এটাও অপব্যাখ্যা করলো যে, বারোজন খলীফা সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভবিষৎবাণী ইসলামের আবির্ভাবকাল থেকে কিয়ামত পর্যন্ত প্রযোজ্য। অর্থাৎ, বারোজন খলীফা প্রাথমিক যুগে পরপর আসবেন – এমন কোন ইঙ্গিত নেই। তারা কিয়ামতের আগেও আসতে পারেন। সুতরাং বারোজন খলীফা অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত এ উম্মতের ধ্বংস নেই। এ কথাগুলো তারা নিজেদের বড় বড় মুসনাদ গ্রন্থে আবু খালিদের বরাত দিয়ে লিপিবদ্ধ করে রেখেছিলেন।

বারোজন খলীফার পর বিশৃঙ্খলা ও ফিতনা দেখা দিবে – রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই ভবিষৎবাণীর ব্যাখ্যা তারা এভাবে করেছে, এ ফিতনা দিয়ে কিয়ামতের পূর্বের ফিতনা ও বিশৃঙ্খলা উদ্দেশ্য। তারা বারোজন খলীফাকে এভাবে গণনা করে – খুলাফায়ে রাশিদার চারজন, ইমাম হাসান, আমীর মুআবিয়া, যুবাইর আর উমর বিন আবদুল আযীয –এ আটজন। নবম খলীফা মুহতাদী, কারন বনু আব্বাসিয়ার খলীফা মুহতাদী বনু উমাইয়ার খলীফা উমর বিন আবদুল আযিযের মতো ন্যায়বিচারক ছিলেন। এরপর মাহদী।

 

বনু উমাইয়ার খিলাফতকে ভীতিপ্রদ বর্ণনাকারী হাদিসসমূহ

ইমাম তিরমিযি (রহঃ) বলেন, ইউসুফ বিন সাদ কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে, ইমাম হাসান (রাঃ) মুয়াবিয়া (রাঃ) এর কাছে বাইয়াতের সময় এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে ইমাম হাসান (রাঃ) কে বলল, আপনি মুসলমানদের লজ্জিত করলেন। তিনি বললেন, আল্লাহ আপনার উপর রহম করুন, আমাকে খারাপ বলবেন না। কারন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক রাতে বনু উমাইয়াকে মিম্বরের উপর দেখে বিহবলিত হয়ে পড়েছিলেন, সে সময় –

إِنَّا أَعْطَيْنَاكَ الْكَوْثَرَ

আর,

إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ

(সূরাহ আল-কাউসার আর সূরাহ আল-কাদর) অবতীর্ণ হয়।

অর্থাৎ,  (সূরাহ আল-কদরের প্রথম তিন আয়াতের অর্থ -) “আমি সম্মানিত রাতে কুরআনকে নাযিল করলাম। আর আপনি কি জানেন সম্মানিত রাত কি ? সম্মানিত রাত এক হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ।” হে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আপনার মৃত্যুর পর বনু উমাইয়া হাজার মাসের মালিক হবে। কাসেম বলেন, আমি হিসাব করেছি, আমীর মুয়াবিয়ার বাইয়াত থেকে হাজার মাস তাদের রাজত্ব ছিল, এতোটুকুও কম বেশী হয়নি।

ইমাম তিরমিযি (রহঃ) বলেন, এ হাদিসটি গরীব। এটি কাসেম কর্তৃক বর্ণিত। যদিও তিনি নির্ভরযোগ্য, কিন্তু তার উস্তাদ মাজহুল। এ হাদিসটি হাকিম মুসতাদরাক গ্রন্থে আর ইবনে জারির নিজের তাফসীর গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেছেন।

হাফেয আবুল হাজ্জাজ (রহঃ) বলেন, হাদিসটি মুনকার (অস্বীকারকারী)। ইবনে কাসিরও একই অভিমত পেশ করেছেন। ইবনে জারির নিজের তাফসীর গ্রন্থে আব্বাস বিন সহলের দাদার বরাত দিয়ে লিখেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বনূ হাকাম বিন আসকে (বনু উমাইয়াকে) স্বপ্নে দেখেন, বাদুড়ের মতো এক মজলিসে নাচছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এটা খুব খারাপ মনে হলো। এরপর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তিনি কোন দিন মুখ খুলে হাসেননি। এ ঘটনার প্রেক্ষাপটে এ আয়াত নাযিল হয় –

وَمَا جَعَلْنَا الرُّؤْيَا الَّتِي أَرَيْنَاكَ إِلَّا فِتْنَةً لِّلنَّاسِ

“আর আমি যে দৃশ্য তোমাকে দেখিয়েছি, সেটা আর কুরআনে উল্লেখিত অভিশপ্ত বৃক্ষ শুধু মানুষের পরীক্ষার জন্য …” (সূরাহ আল-ইসরা, ১৭ :৬০)

এ হাদিসের সনদগুলো দুর্বল। তবে আবদুল্লাহ বিন উমর (রাঃ), ইয়ালা বিন মাররা (রাঃ) আর হুসাইন বিন আলি (রাঃ) এর হাদিসগুলো এ হাদিসের সমর্থক। এ হাদিসটি আমি বিভিন্ন পদ্ধতিতে তাফসীর আর মাসনাদ গ্রন্থে উল্লেখ করেছি। উপরন্তু, আসবাবুন নুযুল গ্রন্থেও এ হাদিসের কিছুটা ইশারা করা হয়েছে।

 

যেসব হাদিসে বনূ আব্বাসিয়া খিলাফতের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে

ইমাম বাযযার সনদসহ আবু হুরায়রা (রাঃ) এর হাদিস লিখেছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আব্বাস (রাঃ) কে বলেন, তোমার লোকদের মধ্যে নবুওয়ত আর রাজত্ব উভয়ই রয়েছে। এ হাদিসের সনদের মধ্যে আমেরী দুর্বল। কিন্তু আবু নুয়াইম দালায়েলুন নবুওয়ত, ইবনে আদি কামেল আর ইবনে আসাকির নিজের গ্রন্থে আমেরীর হাদিসটি কয়েকভাবে বর্ণনা করেছেন।

ইমাম তিরমিযি ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আব্বাস (রাঃ) কে বললেন, সোমবার সকালে আপনার ছেলেকে আমার কাছে নিয়ে আসবেন। আমি তার জন্য দুয়া করে দিবো, যাতে আল্লাহ আপনার আর আপনার আওলাদদের ভালো করেন। আব্বাস (রাঃ) সকালে ছেলেকে কাপড় পড়িয়ে হযরতের খেদমতে নিয়ে আসেন। তিনি দুয়া করলেন, হে আল্লাহ, আব্বাস আর তার ছেলেকে প্রকাশ্য ও গোপন গুনাহের মধ্যে বাঁধবেন না এবং তাদের ক্ষমা করুন। হে আল্লাহ, তাকে আর তার আওলাদকে রক্ষা করুন।

ইমাম তিরমিযি নিজের জামে গ্রন্থে এতটুকুই লিখেছেন। তবে রাযীন আল উবায়দী এ হাদিসটির শেষাংশে এতটুকু বৃদ্ধি করেছেন – তার বংশে আমার খিলাফত জারি রাখবেন। আমার কাছে এ হাদিসটি খুবই চমৎকার। তাবারানি সাওবান থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমি বনু মারওয়ানকে বারবার মিম্বরে উঠতে দেখে খারাপ ভাবলাম। যখন বনূ আব্বাসকে বার বার আসতে দেখলাম, তখন আমার ভালো লাগলো।

আবু নুয়াইম আবু হুরায়রা (রাঃ) এর হাদিস সনদসহ হুলিয়া গ্রন্থে লিখেছেন, একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাইরে এলে আব্বাস (রাঃ) এর সাথে সাক্ষাৎ হয়। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, হে আবুল ফজল, আমি আপনাকে একটি সংবাদ দিবো ? তিনি বললেন, অবশ্যই। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আল্লাহ যে কাজ আমাকে দিয়ে শুরু করিয়েছেন, সে কাজ আপনার সন্তানদের মাধ্যমে সমাপ্ত করবেন।

এর সূত্রগুলো দুর্বল। হযরত আলি (রাঃ) এ হাদিসটি যে সূত্রে বর্ণনা করেছেন তা আরো দুর্বল।

খতীব ইতিহাস গ্রন্থে ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আপনাদের থেকেই এ কাজ শুরু হয়েছে, আপনাদের দিয়েই তা শেষ হবে। শীঘ্রই এ হাদিসের সনদসহ বিস্তারিত বিবরণ মুহতাদি বিল্লাহ অধ্যায়ে আলোচনা করবো।

আম্মার বিন ইয়াসার (রাঃ) এর আরেকটি হাদিস খতীব সনদসহ বর্ণনা করেছেন। আবু নুয়াইম হুলিয়া গ্রন্থে জাবির বিন আবদুল্লাহ (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আব্বাসের বংশোদ্ভূত বাদশাহগণ আমার উম্মতের আমীর হবে। এজন্য আল্লাহ তাদের দ্বীনকে জয়যুক্ত করবেন। (সনদ দুর্বল)

আবু নুয়াইম দালায়েল গ্রন্থে লিখেছেন, ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, উম্মুল ফযল আমার কাছে এ হাদিসটি বর্ণনা করেছেন – তিনি বলেন, আমি একদিন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে উপস্থিত হলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, তোমার গর্ভে পুত্র সন্তান রয়েছে। ভুমিস্ট হলে তাকে নিয়ে আমার কাছে এসো। জন্মগ্রহণ করলে আমি নবজাতককে নিয়ে তার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পবিত্র খেদমতে হাযির হলাম। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সেই পুত্রের ডান কানে আযান আর বাম কানে ইকামত দিলেন। নিজের লালা মুবারক নবজাতকের মুখে দিলেন আর নাম রাখলেন আবদুল্লাহ। এরপর বললেন, খলীফাগণের পিতাকে নিয়ে যাও। আমি সমস্ত ঘটনা আব্বাসের কাছে বর্ণনা করলাম। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে এসে কারন জিজ্ঞেস করলেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমি সত্যিই বলেছি, সে খলীফাগণের পিতা। তার বংশ থেকে সাফফাহ আর মাহদির আবির্ভাব ঘটবে। ঈসা বিন মারইয়াম (আঃ) এর সাথে যিনি নামায আদায় করবেন।

দায়লিমা মুসনাদুল ফেরদৌস গ্রন্থে আয়েশা সিদ্দিকা (রাঃ) এর একটি মারফু হাদিস বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, অচিরেই বনু আব্বাসিয়ার হাতে পতাকা আসবে। যতক্ষণ তারা সত্যের চর্চা করবে, তাদের হাত থেকে পতাকা যাবে না। দারে কুতনী ইফরাদ গ্রন্থে ইবনে আব্বাসের বর্ণনা সনদসহ লিপিবদ্ধ করেছেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আব্বাস (রাঃ) কে বললেন, যতক্ষণ পর্যন্ত আপনার সম্প্রদায় ইরাকে থাকবে, কালো কাপড় পড়বে আর খুরাসানবাসী তাদের সাহায্য করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের কাছেই ক্ষমতা থাকবে। এমন অবস্থায় ঈসা (আঃ) কে তাদের প্রদান করা হবে। এ হাদিসটি দুর্বল। তবে ইবনে জাওযী মাওযুআতের মধ্যে তা বর্ণনা করেছেন।

তাবারানি কাবিরে উম্মে সালমা (রাঃ) এর মারফু হাদিস লিপিবদ্ধ করেছেন। নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আমার চাচার ছেলে আর আমার বাবার পিতামহদের সন্তানদের মধ্যেই খিলাফত থাকবে।

আকেলি কিতাবুয যুআফায় সনদসহ আবু বকর (রাঃ) এর মারফু হাদিস বর্ণনা করেছেন। বনূ উমাইয়ার এক দিনের পরিবর্তে বনূ আব্বাস দুইদিন, আর এক মাসের পরিবর্তে দুই মাস রাজত্ব করবে।

ইবনে জাওজি মাওযুয়াতে এ হাদিসটি বর্ণনা করেন। কারন এ হাদিসের বর্ণনাকারীদের মধ্যে যে খারাপ, তাকে মুহতাম বলা হয়। বস্তুত, খারাপ লোক মিথ্যা বা বর্ণিত হাদিসে মুহতাম নাও হতে পারে। ইবনে আদি এই বর্ণনাকারীকে দুর্বলদের মধ্যে গণ্য করেছেন। কিন্তু তিনি এও বলেছেন, এতে কোন ক্ষতি নেই আর হাদিসের অর্থ যুক্তিগ্রাহ্য নয়। কেননা, বনু আব্বাসিয়ার যুগে শুধু স্পেন ছাড়া পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত তাদের রাজত্ব ছিল। তাদের শাসনামল ১৩০ হিজরি থেকে ২৯০ হিজরি। এরই মধ্যে মুকতাদার খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার প্রশাসনিক পদ্ধতিতে ভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ে, পাশ্চাত্যের ভূখণ্ডগুলো হাতছাড়া হয়ে যায় আর এরপর মুসলিম সাম্রাজ্যে দারুন অরাজকতা, আত্মকলহ আর মতানৈক্য দেখা দেয়, যার বিবরণ সামনে উপস্থাপন করা হবে। এ হিসাব মোতাবেক বনূ আব্বাসিয়ার শাসনামল ছিল ১৬০ বছর। আর বনূ উমাইয়ার ২০ বছর। তারমধ্যে ইবনে যুবায়েরের খিলাফতকাল নয় বছর বাদ দিলে তিরাশি বছর হল। উমাইয়াদের যুগ, যা আব্বাসীয়দের শাসনকালের অর্ধেক সময়।

যুবায়ের বিন বাকার মুআফিকাত গ্রন্থে ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর বর্ণনা নকল করেছেন। ইবনে আব্বাস (রাঃ) মুআবিয়া (রাঃ) কে বললেন, আপনারা যদি একদিন রাষ্ট্র চালান, তবে আমরা দুইদিন; আপনারা এক মাস চালালে আমরা দুই মাস; আপনারা এক বছর চালালে আমরা দুই বছর রাষ্ট্র চালাবো।

যুবায়ের মুআফিকাতে লিখেছেন, ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, কালো পতাকা আমাদের পাশ্চাত্য থেকে শুরু হবে। তারিখে দামেশক গ্রন্থে ইবনে আসাকির লিখেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনবার হযরত আব্বাস (রাঃ) এর জন্য এ দুয়া করেছেন – হে আল্লাহ, আব্বাস আর তার সন্তানদের সাহায্য করুন। এরপর হজরত আব্বাস (রাঃ) কে সম্বোধন করে বলেন, চাচা, আপনি জানেন না, আপনার বংশধরদের মধ্যে মাহদী মুওয়াফফাক খুবই ভালো মানুষ হবেন।

ইবনে সাদ তবকাত গ্রন্থে ইবনে আব্বাসের বর্ণনা লিখেছেনঃ একদিন হযরত আব্বাস (রাঃ) আবদুল মুত্তালিবের বংশধরকে একত্রিত করেন। তিনি আলি (রাঃ) কে খুবই ভালোবাসতেন। এজন্য তিনি তাকে বললেন, আমি তোমার সাথ একটি পরামর্শ করতে চাই, তবে প্রথমে তোমার পরামর্শ ছাড়া চূড়ান্ত ফয়সালা নিতে চাই না। তুমি নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে গিয়ে আরয করো, যদি খিলাফত আমাদের জন্য না হয়, তবে আমরা আজ থেকেই তাকে কোন পাত্তা দিবো না। হজরত আলি (রাঃ) বললেন, হে চাচা, নিশ্চয়ই খিলাফত আপনার জন্যই, কারো শক্তি নেই আপনার থেকে তা কেড়ে নিবে।

 

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

দাইলামী মুসনাদুল ফেরদৌস গ্রন্থে লিখেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাআলা বাদশাহীর জন্য যে জাতিকে সৃষ্টি করেছেন, তিনি সে জাতির কপালে হস্ত সঞ্চালন করে দিয়েছেন। এ হাদিসের একজন বর্ণনাকারী মাইসারা, তিনি পরিত্যক্ত। দাইলামী এই হাদিসটি তিন পদ্ধতিতে বর্ণনা করেছেন। হাকিম তার মুসতাদরাক গ্রন্থে ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে এ হাদিসটি বর্ণনা করেছেন।

 

 

 

রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাদর, যা সর্বশেষ খলীফা পর্যন্ত হস্তান্তরিত হয়েছে

সলফী ত্বওরিয়াতে লিখেছেন, কাব বিন যুবাইর (রাঃ) স্বরচিত কবিতা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শানে আবৃত্তি করলে তিনি পরনের চাদরটি কাবের প্রতি এ মর্মে চিঠি লিখেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাদরটি দশ হাজার দিরহামের বিনিময়ে আমাকে দিয়ে দাও। কিন্তু তিনি তা দেননি। কাবের মৃত্যুর পর হযরত মুয়াবিয়া (রাঃ) তার সন্তানদের কাছ থেকে বিশ হাজার দিরহামে চাদরটি কিনে নেন। এরপর সে চাদরটি বনূ আব্বাসিয়ার খলীফাদের কাছে হস্তান্তরিত হয়।

সলফী ছাড়াও অন্য লোকেরা এমনই বলেছে।

যাহাবী স্বরচিত ইতিহাস গ্রন্থে এটাও লিখেছেন, খলীফাদের চাদরটি হযরত মুয়াবিয়ার খরিদকৃত চাদর না, বরং সেটি ঐ চাদর, যা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাবুক যুদ্ধে শান্তির প্রতীকস্বরূপ নিজের চিঠিসহ আয়লাবাসীর প্রতি পাঠান। এরপর সাফফাহ তিনশো দিনারে চাদরটি কিনে নেন। আমার মতে, হযরত মুয়াবিয়া যে চাদর কিনেছিলেন, তা আব্বাসীয় যুগে চুরি হয়ে যায়। ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহঃ) যুহদ গ্রন্থে লিখেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে চাদর পড়ে প্রতিনিধি দলের সাথে সাক্ষাৎ করতেন, তা মোতি-মুক্তা খচিত ছিল। চার হাত লম্বা, দুই হাত প্রস্থ এ চাদরটি খলীফাদের কাছে ক্রমান্বয়ে হস্তান্তরিত হয়। চাদরটি খুবই পুরানো হওয়ায় তা কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হতো। খলীফাগণ দুই ঈদে চাদরটি পড়তেন। উত্তরাধিকার সূত্রে চাদরটি এক খলীফা থেকে অপর খলীফার হাতে চলে যেতো। বড় বড় অনুষ্ঠানে তারা চাদরটি বরকতের জন্য পড়তেন।

কথিত আছে, যখন মুকতাদার ফিতনায় আক্রান্ত হয়ে নিহত হন, তখন এ চাদরটি তিনি পড়ে ছিলেন। তার রক্তে চাদরটি অপবিত্র হয় আর সেখানেই তা নষ্ট হয়ে যায়।

 

কিছু ফাওয়ায়েদঃ

বর্ণিত আছে যে, আব্বাসীয় বংশের খলীফাগণের মধ্যে একজন শুরু করেছেন, একজন মধ্যবর্তীতে রয়েছেন, আর একজন শেষ করেছেন। মনসুর প্রবর্তনকারী, মামুন মধ্যবর্তীতে অবস্থানকারী আর মুতাদার সর্বকনিষ্ঠ। আব্বাসীয় বংশের খলীফাদের মধ্যে সাফফাহ, মাহদী আর আমীন ছাড়া বাকি সকলেই দাসীর গর্ভজাত সন্তান। হযরত আলি বিন আবু তালিব, হাসান বিন আলি বিন আবু তালিব এবং আমীন বিন রশিদ ছাড়া হাশেমি বংশীয় খলীফা হাশেমি মায়ের গর্ভজাত নন। এ বর্ণনাটি সুলী বর্ণনা করেছেন।

যাহাবি বলেন, হজরত আলি বিন আবু তালিব আর আলি আল মুকতাফী ছাড়া কোন খলীফার নাম আলি ছিল না। আমি বলছি, অধিকাংশ খলীফার নাম একক, নকল নাম অনেক কম। আবদুল্লাহ, আহমদ, মুহাম্মাদ – এই নামগুলো অনেকের ছিল।

বাগদাদের সর্বশেষ খলীফা মুতাসিম পর্যন্ত সকলেই পৃথক উপাধি ধারণ করেছিলেন। মিসরে খলীফাগণ আগের খলীফাদের উপাধি অনুসরণ করে নিজেদের উপাধি ধারণ করেন,যেমন – মুসতানসির, মুসতাকফী, ওয়াসেক, হাকিম, মুতাদাত, মুতাওয়াক্কিল, মুসতাসিম, মুসতাইন, কায়িম, মুসতানজিদ। এর মধ্য থেকে মুসতাকফী আর মুসতানসির তিনজনের উপাধি ছিল, বাকিগুলো দুই জনের।

বনু আব্বাসিয়ার খলীফাগণের মধ্যে কেউ বনু উবাইদির খলীফাদের উপাধি গ্রহণ করেননি। কায়িম, হাকিম, তাহির আর মুসতানসির ছাড়া। মাহদি আর মনসুর আগে থেকেই উবাইদিদের উপাধি ছিল। বনু আব্বাসিয়ার মধ্যেও সে উপাধি ছিল।

কেউ কেউ বলেন, কাহির উপাধি ধারণ করে খলীফা বা বাদশাহ সফলকাম হতে পারেন না। আমার মতে, মুসতাকফী আর মুসতাইন উপাধি ধারণকারীর একই অবস্থা। দেখুন, আব্বাসীয়দের মধ্যে দুইজন খলীফার উপাধি ছিল অনুরূপ। তাদের পতন হয়েছে। তবে মুতাযদ খুবই সুন্দর উপাধি।

ভাতিজার স্থানে মুকতাদা আর মুসতানসির ছাড়া আর কেউ বসেননি। মুকতাদা রাশেদের পর আর মুসতানসির মুতাসিমের পর খলীফা হোন। (যাহাবী) একই পিতার তিন পুত্র আমীন, মামুন, মুতাসিম ছাড়া হারুন রশিদের বংশে মুসতানসির, মুতায ছাড়া মুতাওয়াক্কিলের বংশে রাযী, মুকতাদা আর মতী ছাড়া মুকতাদার বংশে কেউ খিলাফতের দায়িত্বে আসেনি।

আবদুল আম্লিকের চার সন্তান খিলাফতের দায়িত্ব নিয়েছিলেন, যার দৃষ্টান্ত খলীফাদের মধ্যে নেই। তবে এ দৃষ্টান্ত রাজা বাদশাহদের মধ্যে বিদ্যমান। আমি বলেছি, এ দৃষ্টান্ত খলীফাদের মধ্যে নেই। মুতাওয়াক্কিলের পাঁচ সন্তান ছিল – মুসতাইন, মুতাযদ, মুসতাকফী, কায়িম আর মুসতানজিদ। পিতা জীবিত থাকা অবস্থায় হযরত আবু বকর (রাঃ) আর বকর আল তায়ী বিন মতী ছাড়া কেউ খলীফা হননি। আবু বকর আল তায়ী’র পিতার প্যারালাইসিস হওয়ায় তিনি ছেলেকে খলীফা মনোনীত করেন।

ওলামায়ে কেরাম বলেন, যিনি পিতার জীবদ্দশায় খিলাফতের কর্ণধার হয়েছেন, তিনি আবু বকর (রাঃ)। তিনি যুবরাজ নির্ধারিত করেছিলেন, সর্বপ্রথম বাইতুল মাল গঠন করেন আর কুরআন শরীফকে গ্রন্থ আকারে রূপ দেন।

যিনি সর্ব প্রথম আমিরুল মুমিনীন বলেছেন, চাবুক মারার প্রথা প্রবর্তন করেছেন, হিজরি সনের সূচনা করেছেন, ইতিহাস অধ্যয়নের নির্দেশ দিয়েছেন আর বিচারালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন, তিনি হলেন উমর ফারুক (রাঃ)।

উসমান গনী (রাঃ) সর্বপ্রথম চারণভূমি নির্ধারণ করেন, জায়গীর দেন, জুমআর প্রথম আযান আর মুয়াযযিনদের ভাতা নির্ধারণ করেন, খুৎবায় কম্পন সৃষ্টি না করা আর পুলিশ নিয়োগ দেন।

যিনি সর্বপ্রথম নিজের জীবদ্দশায় নিজের পুত্রকে যুবরাজ হিসেবে ঘোষণা দেন আর নিজ সেবার জন্য লোক নিয়োগ করেন, তিনি হলেন মুয়াবিয়া (রাঃ)।

যার দরবারে সর্বপ্রথম শত্রুর কাটা মাথা এসেছিলো, তিনি হলেন যুবায়ের (রাঃ)।

সর্বপ্রথম মুদ্রায় নিজের নাম অংকন করেন আবদুল মালিক বিন মারওয়ান।

সর্বপ্রথম নিজের নাম ঘোষণা করতে নিষেধ করেছিলেন ওয়ালিদ বিন আবদুল মালিক।

বনু আব্বাসিয়ার খলীফাগণ সর্বপ্রথম নতুন নতুন উপাধি আবিস্কার করেন।

ইবনে ফাজলুল্লাহ বলেন, কেউ কেউ বলেছেন, বনূ আব্বাসীয়ার মতো বনু উমাইয়াও উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। আমার মতে, কিছু ঐতিহাসিক লিখেছেন যে, মুয়াবিয়া (রাঃ) আন-নাসিরুদ্দীনিল্লাহ, ইয়াযিন আল মুসতানসিরি, মুয়াবিয়া বিন ইয়াযিদ আর রাজি ইলাল হাক, মারওয়ার আল মুতামিন বিল্লাহ, আবদুল মালিক আল মুওয়াফফিক আমরিল্লাহ, তার ছেলে ওয়ালিদ আল মুনতাকসিম বিল্লাহ, উমর বিন আবদুল আযিয আল মাসুম বিল্লাহ, ইয়াযিদ বিন আবদুল মালিক আল কাদির বি সুনাআল্লাহ আর ইয়াযিদ নাকেস আল শাকির বিন আন আমিল্লাহ উপাধি গ্রহণ করেন।

যার প্রতিশ্রুতি নিয়ে বিভিন্ন কথা হয়েছিলো, তিনি হলেন সাফফাহ।

যিনি সর্বপ্রথম জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের ডেকে তাদের কথা মতো কাজ করতেন আর নিজের গোলামদের বিচারক পদে অধিষ্ঠিত করেন আর আরবদের চেয়ে তাদের প্রাধান্য দিতেন, তিনি হলেন মানসুর।

মাহদি সর্বপ্রথম ভিন্ন মতাবলম্বীদের মতবাদ খণ্ডনের জন্য গ্রন্থ রচনা করান।

যিনি সর্বপ্রথম লাগামের মধ্যে অসি, বল্লম প্রভৃতি নিয়ে সৈন্য পরিচালনা করেন তিনি হলেন হাদী।

যিনি সর্বপ্রথম হকি খেলেছেন তিনি হারুনুর রশিদ।

যে খলীফাকে সর্বপ্রথম উপাধিসহ ডাকা হয় আর যিনি সর্বপ্রথম উপাধিসহ নিজের নাম লিখেছেন তিনি হলেন আমীন।

মুতাওয়াক্কিল সর্বপ্রথম অমুসলমান বন্দীদের পোশাক নির্দিষ্ট করেন। মুতাওয়াক্কিলকে সর্বপ্রথম তুর্কীরা শহীদ করে দেয়। এ ঘটনা নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি হাদিসের সমর্থক, যা তাবারানি ইবনে মাসউদ থেকে নকল করে বর্ণনা করেছেন। নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তুর্কীরা যতক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের অবকাশ দিবে, তার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তোমরা তাদের অবকাশ দিবে। কারন সর্বপ্রথম তারাই আমার উম্মতের বাদশাহী আর আল্লাহ’র নিয়ামত কেড়ে নিবে।

যিনি সর্বপ্রথম জরির পাড়যুক্ত পোশাক আর ছোট টুপি ব্যবহার করেছেন, তিনি মুসতাইন।

মুতায সবপ্রথম ঘোড়াকে স্বর্ণের অলংকারাদি পড়ান।

যার উপর সর্বপ্রথম অত্যাচার ও প্রতিশোধ গ্রহণ করা হয়, তিনি হলেন মুতামাদ। তার সকল খরচ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিলো আর তাকে গৃহবন্দী করে রাখা হয়।

যিনি সর্বপ্রথম বিচলিত অবস্থায় খলীফা মনোনীত করেছিলেন, তিনি হলেন মুকতাদার।

রাযী হলেন শেষ খলীফা, যাকে অর্থ আর সৈন্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। তিনি কবিতা আকারে খুৎবা দিতেন, সবসময় নামাজের ইমামতি করতেন, সভাষদের নিজের সামনে বসিয়ে পরামর্শ করতেন, খুলাফায়ে রাশেদীনদের চালচলন মেনে চলতেন।

মুসতানসির সর্বপ্রথম ব্যবহৃত উপাধি গ্রহণ করেন, যিনি মুসতানসিনের পর খলীফা হোন।

আওয়ালে আসকারী গ্রন্থে রয়েছে, যিনি সর্বপ্রথম মায়ের জীবদ্দশায় খলীফা হোন, তিনি হলেন উসমান গনী (রাঃ)। এরপর হাদী, রশিদ, আমীন, মুতাওয়াক্কিল, মুসতানসির, মুসতাইন, মুতায, মুতাযদ আর মতী। আবু বকর (রাঃ) আর আল তায়ী ছাড়া কেউ পিতার জীবদ্দশায় খিলাফতের তখতে আরোহণ করেননি।

সূলী বলেন, আবদুল মালিকের দুই পুত্র ওয়ালিদ আর সুলাইমানের জননী ইয়াযিদ নাকেয আর ইব্রাহীমের জননী শাহীন এবং হাদী ও রশীদের জননী খিযরান ছাড়া কোন নারী দুজন খলীফা প্রসব করেন নি। তবে আমার মতে, এক্ষেত্রে আব্বাস ও হামযার জননী এবং দাউস ও সুলাইমানের জননীকে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। দাউদ আর সুলাইমান মুতাওয়াক্কিলের শেষ দুই সন্তান।

ফায়দা ১ – বনু উবাইদের চৌদ্দ জন খলীফা উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। তারা হলেন মাহদী, কায়িম, মানসুর, মুয়ায, আযিয, হাকিম, তাহির, মুসতানসির, মুসতালা, আমর, হাফিয, জাফর, কায়েম, আসেদ মিসর। তাদের বাদশাহীর সূচনা ২৯০ হিজরিতে আর পতন ৫৬৭ হিজরিতে।

ফায়দা ২ – যাহাবী বলেন, তাদের রাজত্ব অগ্নি উপাসক আর ইহুদীদের রাজ্যের অনুরূপ ছিল। সুতরাং তাদের রাজত্বকে খিলাফত বলা যেতে পারে না।

ফায়দা ৩ – পাশ্চাত্যে বনু উমাইয়ার মধ্য থেকে যারা খিলাফত প্রাপ্ত হয়েছিলেন, তারা উবাইদিদের তুলনায় শরীয়ত, সুন্নত, ইনসাফ, দয়া, জ্ঞান, জিহাদ প্রভৃতি থেকে উত্তম। তারা সংখ্যায় বেশী ছিল আর স্পেনে একই সময়ে পাচজন খলীফা দাবী করে।

অনেক প্রবীণ ওলামায়ে কেরাম খলীফাদের ইতিহাস লিখেছেন। তাদের মধ্য থেকে লাফজুয়া নাহবী দুই খণ্ডে একটি ইতিহাস গ্রন্থ রচনা করেন। এতে তিনি কাহিরের যুগ পর্যন্ত লিপিবদ্ধ করেছেন। সূলী শুধু বনু আব্বাসিয়ার ইতিহাস সম্বলিত একটি ইতিহাস প্রণয়ন করেছেন, এটি আমি দেখেছি। তিনিও কাহিরের যুগ পর্যন্ত লিখেছেন। ইবনে জাওজী শুধু আব্বাসীয়দের ইতিহাস লিখেছেন, এতে নাসিরের যুগের ঘটনাবলী স্থান পেয়েছে। এ বইটিও আমি অধ্যয়ন করেছি। আবুল ফজল আহমদ বিন আবু তাহির আল মুরুযী ২৮০ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন। তিনি বড় মাপের কবি আর সুলেখক ছিলেন। তিনিও আব্বাসিয়দের ইতিহাসনির্ভর একটি গ্রন্থ লিখেন। এতে বনূ আব্বাসিয়ার আমীর আবূ হারুন বিন মুহাম্মাদ আল আব্বাসীয়ার যুগ পর্যন্ত উল্লেখ রয়েছে।

ফায়দা ৪ – খতীব লিখেছেন, হযরত উসমান বিন আফফান (রাঃ) আর মামুন ছাড়া কোন খলীফা কুরআনের হাফেজ ছিলেন না। আমার মতে এটি ভুল। বরং বিশুদ্ধ অভিমত হলো, আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ) ও কুরআনের হাফেজ ছিলেন। একদল ঐতিহাসিক এ অভিমতের সমর্থক। নববী তাহযীব গ্রন্থে লিখেছেন, নবী আকরাম  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওফাতের পর আলি (রাঃ) কুরআন হিফয করেন।

ফায়দা ৫ – ইবনুস সায়ী বলেন, খলীফা তাহিরের বাইয়াত গ্রহণের সময় আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। তাহির সাদা কাপড় পড়ে ছাতার নিচে উপবেশন করেছিলেন। তিনি নিজের চাদর পড়ে ছিলেন আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাদরটি কাঁধের উপর রেখেছিলেন। মন্ত্রী পরিষদ মিম্বরে আর সেনাপতিগণ সিঁড়ির উপর দাঁড়িয়ে ছিলেন। লোকদের থেকে এ কথা বলে তিনি বাইয়াত গ্রহণ করাচ্ছিলেন – আমি আপনাদের নেতা ও ইমাম, যার অনুসরণ ও আনুগত্য করা পৃথিবীর সকলের জন্য ফরয। তার পবিত্র নাম শরীফ, সুন্নতে রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আর আমিরুল মুমিনীনের ইজতিহাদের জন্য বাইত করছি। তিনি ছাড়া আর কোন খলীফা নেই।