পরকালের পথে যাত্রা – পর্ব ০৯ – কিয়ামতের বড় লক্ষণ দাজ্জাল ও ঈসা আ.

আলহামদুলিল্লাহ, ওয়াসসালাতু ওয়াসসালাম আলা রাসুলিল্লাহ।

কোন জায়গা থেকে দাজ্জাল আত্মপ্রকাশ করবেএ প্রসঙ্গে তিরমিযি, ইবনে মাজাহ এবং আহমেদে একটি সহিহ বর্ণনায় এসেছে, যেখানে রাসুলুল্লাহ (সা) বলেছেন,খোরাসান নামক পূর্বদিকের একটি অঞ্চল থেকে দাজ্জাল আত্মপ্রকাশ করবে খোরাসান হল ইরান বা মধ্য এশিয়ার একটি অঞ্চল। বর্তমানে ইরানের একটি প্রদেশের নাম খোরাসান কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা) এর সময় খোরাসান অনেক বড় একটি অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত ছিল, যা মধ্য এশিয়ার কোন কোন অঞ্চলও হতে পারে।

সে কোন কোন জায়গায় যেতে পারবে? মক্কা এবং মদিনা ছাড়া পৃথিবীর সব জায়গায় দাজ্জাল যেতে পারবে। দাজ্জালের ফিতনা সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা) বলেছেন, আদমের সৃষ্টির পর থেকে বিচারদিবসের আগ পর্যন্ত দাজ্জালের চেয়ে বড় আর কোন ফিতনা নেই

রাসুলুল্লাহ (সা) আরো বলেছেন, দাজ্জালের কাছে থাকবে জান্নাত আর জাহান্নাম, কিন্তু তার জান্নাত হবে জাহান্নাম আর তার জাহান্নাম হবে জান্নাত। সহিহ মুসলিম

অর্থাৎ, সে এমন সব নিয়ামত নিয়ে হাজির হবে যা দেখে সেটাকে জান্নাতের মত মনে হবে, আর সে এমন সব শাস্তিও নিয়ে হাজির আসবে যেটাকে মনে হবে জাহান্নাম। আর এভাবেই সে মানুষের সাথে প্রতারণা করবে। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা) আমাদেরকে উপদেশ দিয়ে গেছেন যে তোমরা তার কথায় প্ররোচিত হয়ো না, কারণ তার জান্নাত হবে জাহান্নাম আর তার জাহান্নাম হবে জান্নাত।

সহিহ মুসলিমের অপর একটি বর্ণনায় রাসুলুল্লাহ (সা) বলেছেন, দাজ্জাল সম্পর্কে আমি স্বয়ং দাজ্জালের চেয়ে বেশি জানি। তার কাছে রয়েছে দুইটি নদী, যার মধ্যে একটি দিয়ে সাদা পানি বয়ে যায় এবং অপরটি দিয়ে বয়ে যায়আগুন। তোমাদের কেউ যদি সেই সময় পর্যন্ত বেচে থাকো, তাহলে চোখ বন্ধ করে তার আগুনে ঝাপ দিও, কারণ তা হচ্ছে আসলে ঠান্ডা পানি।

এগুলো হচ্ছে দাজ্জালের অন্যতম কয়েকটি ফিতনা। সুবহানাল্লাহ, আরেকটি হাদিস পড়লে আপনারা বুঝতে পারবেন মানুষ তখন কি ধরনের ফিতনার মধ্যে বসবাস করবে।

সাহাবারা (রা) বর্ণনা করেন যে, একদা রাসুলুল্লাহ (সা) আমাদেরকে দাজ্জাল সম্পর্কে এত বেশি বললেন যে আমাদের মনে হচ্ছিলো যে দাজ্জাল যেন মদীনাতে এসেই পড়েছে। তারপর আমরা যখন রাসুলুল্লাহ (সা) এর কাছে গেলাম, তিনি আমাদের অবস্থা বুঝতে পারলেন। তিনি প্রশ্ন করলেন, তোমাদের কি হয়েছে? আমরা জবাব দিলাম ইয়া রাসুলুল্লাহ (সা), আপনি আমাদেরকে দাজ্জাল সম্পর্কে এত বেশি বলেছেন যে আমাদের মনে হচ্ছে মদিনার খেজুর গাছগুলোর পাশেই বুঝি দাজ্জাল এসে পড়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা) বললেন, আমার জীবদ্দশায় যদি তার আবির্ভাব ঘটে, তাহলে আমি তার মোকাবেলা করবো, কিন্তু সে যদি আমার মৃত্যুর পরে আসে, তাহলে তোমাদের প্রত্যেককে নিজ নিজ নফসের দায়িত্ব নিতে হবে তারপর রাসুলুল্লাহ (সা) সব মুমিনদের রক্ষার জন্য আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করেন।

রসুলুল্লাহ (সা) আরও বলেন, সে হবে একজন যুবক এবং তার একটি চোখ ঝুলে থাকবে তোমাদের কেউ যদি তার সময় পর্যন্ত বেচে থাকো, তাহলে তার সামনে সূরা কাহফের প্রথম আয়াতটি তেলাওয়াত করবে। রাসুলুল্লাহ (সা) আরও বলেন, ইরাক আর শামের মাঝখানে দাজ্জাল আসবে এবং সে পুরো পৃথিবীর ডান থেকে বাম পর্যন্ত কলুষিত করে ফেলবেসে চল্লিশ দিন পৃথিবীতে অবস্থান করবে, তার মধ্যে একটি দিন হবে এক বছরের সমান, দ্বিতীয়টি হবে এক মাসের সমান, তার পরের দিনটি হবে এক সপ্তাহের সমান, আর বাকি দিনগুলো হবে সাধারন দিনের মতো’”

একথা শুনে সাহাবা (রা) রাসুলুল্লাহ (সা) কে একটি প্রশ্ন করেন, একটি চমৎকার প্রশ্ন। কি সেই চমৎকার প্রশ্ন ?
রাসুলুল্লাহ (সা) যখন তাদেরকে দাজ্জালের কথা বলছেন, বলছেন যে এক দিন হবে এক বছরের সমান, দ্বিতীয়টি এক মাস এবং তৃতীয়টি এক সপ্তাহের সমান, তখন সাহাবাদের মনে কী প্রশ্ন আসতে পারে,কী মনে হয় আপনাদের? এই প্রশ্নটি শুনলে আমরা বুঝতে পারবো সাহাবাদের মনে কি ছিল তখন।

সাহাবারা জিজ্ঞেস করলেন সালাত সম্পর্কে । এখান থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, তাঁরা কতোটা উদ্বিগ্ন ছিলেন সালাত নিয়ে। দাজ্জালের কথা শুনেও তাঁরা তাদের সালাতের কথা ভুলে জাননি, বরং সবার আগে তাদের মনে যে প্রশ্ন জাগল হল, তা হচ্ছে সালাত। তাঁরা বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ, যে দিনটি এক বছরের সমান হবে সেদিন কি আমাদের প্রত্যহ সালাতই যথেষ্ট হবে? রাসুলুল্লাহ (সা) বললেন, না, তখনকার জন্য তোমরা আনুমানিক হিসেব করে নিবে সালাহ আদায় করবে।

সাহাবারা (রা) প্রশ্ন করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ (সা), দাজ্জাল কেমন দ্রুত চলবে? রাসুলুল্লাহ (সা) জবাবে বলেন, বাতাস যেমন মেঘকে ভাসিয়ে নিয়ে চলে, তেমনই হবে তার গতি। অর্থাৎ সে খুব দ্রুত চলবে।

রাসুলুল্লাহ (সা) আরও বলেন, সে একদল মানুষের নিকট যাবে এবং তাদেরকে মিথ্যা ধর্মের দিকে আহ্বান করবে, লোকেরা তাকে অনুসরণ করবে আর দাজ্জাল আকাশকে আদেশ করবে বৃষ্টি বর্ষণের জন্য, তখন বৃষ্টি হবে এবং জমিন তার ফসলাদি বের করে দিবে। সন্ধ্যা বেলায় তাদের গৃহপালিত পশুরা ঘরে ফিরবে মোটাতাজা অবস্থায়, তাদের পালান ভর্তি থাকবে দুধে। দাজ্জালের বৈষয়িক এবং অলৌকিক অনেক ক্ষমতা থাকবে যার দ্বারা সে আকাশকে বৃষ্টির আদেশ করবে, জমিনকে ফসল উৎপাদন করার আদেশ দিবে। দাজ্জাল এরকম ফিতনা নিয়েই আসবে। মানুষ দুনিয়ার ধন-সম্পদ ভোগ করতে ভালবাসে আর দাজ্জাল সেই দুর্বলতাকেই কাজে লাগাবে। আর এভাবেই সে মানুষকে বিপথগামী করবে।

তারপর রাসুলুল্লাহ (সা) বলেন, অতঃপর দাজ্জাল আরেক দল মানুষের কাছে যাবে আর তাদেরকেও মিথ্যা ধর্মের দিকে আহবানকরবে, কিন্তু তাঁরা তাকে প্রত্যাখ্যান করবে। এরপর সে সেখানে বৃষ্টি হতে দেবে না,সে এলাকার মাটিতে ফল-মূল গাছগাছালি হতে দেবে না, সেই লোকগুলোর পশুপাখি মারা যাবে। এরপর সে ঐভাবেই সে এলাকা ত্যাগ করবে এবং এলাকাবাসীর হাতে সম্পদ বলতে কিছুই থাকবে না। এমনই কঠিন হবে দাজ্জালের ফিতনা।

সে জমিনের উপর হাঁটবে এবং জমিনকে আদেশ করবে তার ভেতরকার সম্পদ বের করে আনতে, এরপর জমিন থেকে মহামূল্যবান সম্পদ তার সামনে মৌমাছির ঝাঁকের মতো জড়ো হয়ে যাবে। আপনারা জানেন যে রানী মৌমাছি যখন মৌচাক থেকে বের হয়ে আসে, তখন করমি মৌমাছিরা ঝাঁক বেধে তাকে অনুসরণ করে। দুনিয়ার ধন-সম্পদ সেভাবেই দাজ্জালকে অনুসরণ করবে।

তারপর সে এক যুবককে ডাকবে এবং তরবারি দিয়ে তাকে দু-টুকরো করে ফেলবে, অতঃপর সে যখন আবার সেই মানুষটিকে ডাকবে, আল্লাহর ইচ্ছায় মানুষটি আবার হাসিমুখে জীবিত হয়ে যাবে।

এটা একটি ফিতনা, মহা ফিতনা। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা। আল্লাহ সুবহানা ওয়া তাআলা দাজ্জালকে অলৌকিক ক্ষমতা দিবেন মানুষকে পরীক্ষা করার জন্য। আমাদের কখনই দাজ্জালের ফিতনাকে ছোট করে দেখা উচিৎ নয়। আমরা বিষয়টা ভালোভাবে অনুধাবন করতে পারবো যদি নিজেদের জীবনের দিকে তাকাই।

আমাদের দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাত জামাতে আদায় করা ওয়াজিব। কিন্তু আমরা সবাই অনেক জামাত বাদ দেই এবং তার জন্য আমরা নানাবিধ অজুহাত পেশ করে থাকি। এখন ধরুন আপনাকে বলা হলো যে প্রতি ওয়াক্ত সালাতের জন্য আপনাকে পাঁচ হাজার টাকা দেয়া হবে, যেই মুহূর্তে আপনি সালাতে হাজির হবেন তৎক্ষণাৎ আপনাকে পাঁচ হাজার টাকা দেয়া হবে, তাহলে আপনি কি সালাতে আসা থেকে বিরত থাকবেন? নিজেকেই প্রশ্ন করে দেখুন, পাঁচ হাজার টাকা কি আপনাকে মসজিদে নিয়ে আসতে পারে কিনা। এখন ভাবুন, আমরা যেখানে মাত্র পাঁচ হাজার টাকার লোভই সামলাতে পারি না, আর দাজ্জাল যখন পৃথিবীর সমস্ত স্বর্ণ ও রৌপ্য নিয়ে আমাদেরকে আহ্বান করবে এবং যে তার অনুসারী হবে, সে যা চাইবে দাজ্জাল তাকে তাই দিবে। আর যদি কেউ তার অনুসরণ না করে, দাজ্জাল সেই ব্যাক্তির সমস্ত কিছু ছিনিয়ে নিবে। তখন আমরা লোভ সামলাতে পারবো তো?

আমার প্রিয় ভাই ও বোনেরা, কিসে আমাদেরকে ইবাদাত থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে, বলুন তো? এটা হচ্ছে দুনিয়ার প্রতি আমাদের আসক্তি। আজকে ১০ হাজার টাকা, কিংবা ১৫ হাজার টাকা কিংবা আরো অনেক বেশি টাকা-পয়সা আমাদেরকে ইবাদাত থেকে বিমুখ করে রেখেছে, এই অল্প টাকা-পয়সাই যদি আমদের ফিতনার কারণ হয় তাহলে দাজ্জাল কি প্রস্তাব করবে সেটার কথা একটু ভাবুন। সে যা নিয়ে আসবে তার তুলনায় এই হাজার কিংবা লক্ষ টাকা কিছুই না। দাজ্জালকে যে অনুসরণ করবে, সে যা চাইবে, তাই পাবে আর যে তাঁর অনুসরণ করবে না, তাঁর সম্পদ বলে কিছুই বাকি থাকবে না। বাকি জীবনটা তাঁকে দারিদ্র্যের মধ্যে কাটাতে হবে। তাই এই ফিতনা হবে অত্যন্ত মারাত্মক। শুধু সম্পদই নয়, দাজ্জালের ক্ষমতা, শৌর্য,  প্রভাব এবং গৌরব মানুষকে বিমোহিত করবে। আর সে জন্যই সব মূর্খ লোকেরা তার অনুসরণ করবে, যাদের ঈমান থাকবে দুর্বল।

সহিহ বুখারির একটি বর্ণনায়, আবু সাইদ খুদরি (রা) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা) আমাদেরকে বলেছেন, দাজ্জাল মদিনায় প্রবেশ করতে চাইবে কিন্তু সে মদিনায় প্রবেশ করে পারবে না। সে মদিনার বাইরে অপেক্ষা করবে এবং তখন তার কাছে একজন লোক আসবে, যে হবে তাঁর সময়ের শ্রেষ্ঠ অথবা অন্যতম শ্রেষ্ঠ একজন মানুষ। সে দাজ্জালকে বলবে, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে তুই হচ্ছিস দাজ্জাল যার কথা রাসুলুল্লাহ (সা) আমাদেরকে বলে গিয়েছেন। দাজ্জাল সমবেত জনতাকে উদ্দেশ্য করে বলবে, আমি যদি এই মানুষটিকে হত্যা করি এবং তাকে আবার জীবন দেই, তাহলে তোমরা কি আমার প্রতি আর কোন সন্দেহ পোষণ করবে? জনতা বলবে, না। দাজ্জাল সেই মানুষটিকে হত্যা করবে এবং তাকে আবার জীবন দিবে। সেই মানুষটি বলবে, আল্লাহর কসম, আমি এখন তোকে আগের চেয়ে ভাল করে চিনি। অতঃপর দাজ্জাল তাকে হত্যা করতে চাইবে কিন্তু এবার তাকে সে ক্ষমতা দেয়া হবে না।’’

দাজ্জাল সেই ইমানদার ব্যাক্তিকে হত্যা করতে পারবে না। আল্লাহ সুবহানা ওয়া তাআলা তাঁকে তাঁর ঈমান ও তাওয়াক্কুলের জন্য দাজ্জালের হাত থেকে রক্ষা করবেন।

সুবহানাল্লাহ, দাজ্জালের আরেকটি ফিতনার কথা, এই বর্ণনায় বলা হচ্ছে, দাজ্জাল এক আরব বেদুইনকে ডেকে তাকে বলবে, আমি যদি তোমার বাবা-মাকে জীবিত করে দেই, তুমি কি আমার উপর ঈমান আনবে? বেদুইন বলবে, হ্যা আনবো। তখন দুটি শয়তান সেই বেদুইনের বাবা-মায়ের রুপ ধরে তার সামনে আসবে এবং দাজ্জালকে দেখিয়ে তাকে বলবে, হে আমার পুত্র, তাকে অনুসরণ করো,কারণ সে হচ্ছে তোমার প্রভু। ’’ কি জঘন্য একটি ফিতনা!

এখন আমরা ইনশাআল্লাহ দাজ্জালের ফিতনা থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় সমূহ জানবো। প্রথমতই যা আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তা হচ্ছে ঈমান। আপনার ঈমান বাড়ানোর জন্য অপেক্ষা করবেন না, তাহলে তা কখনই বাড়বে না। কারণ অপর একটি হাদিসে আছে, তিনটি জিনিসের আবির্ভাবের পর যদি কোন মানুষের ঈমান না থাকে, তাহলে তার ঈমান তার কোন কাজেই আসবে না। তিনটি জিনিস, তন্মধ্যে একটি হচ্ছে দাজ্জাল। দাজ্জাল আসার পর আর কেউ ঈমান বৃদ্ধি করতে পারবে না। তাই তার আবির্ভাবের পূর্বেই যা করার করতে হবে, আমাদের ঈমানকে মজবুত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, দাজ্জালের ফিতনা থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা। রাসুলুল্লাহ (সা) সালাতে তাশাহুদের পরে একটি দোয়া পড়তেন, যা কোন কোন আলেমের মতে পড়া ওয়াজিব, কারণ রাসুলুল্লাহ (সা) সব সময় এই দোয়াটি পড়তেন তাশাহুদের পরে এবং সালামের আগে। সেই দোয়ায় রাসুলুল্লাহ (সা) বলতেন,

আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিন আযাবি জাহান্নাম, ওয়া মিন আযাবিল কাবার, ওয়া মিন ফিতনাতিল মাহইয়া ওয়া মামাত, ওয়া মিন শাররিল ফিতনাতি মাসিহি দাজ্জাল

দু’আটির অর্থ হচ্ছে, হে আল্লাহ, আমি জাহান্নামের আজাব থেকে তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি এবং কবরের আজাব থেকে এবং জীবন ও মৃত্যুর ফিতনা থেকে এবং দাজ্জালের ফিতনা থেকে।

রাসুলুল্লাহ (সা) জাহান্নাম থেকে, কবরের আযাব থেকে এবং দাজ্জালের ফিতনা থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। যেহেতু রাসুলুল্লাহ (সা) সব সময় এই দোয়া করতেন, আমাদেরও উচিৎ এই দু’আটি সব সময় করা।

তৃতীয়ত, সূরা কাহফের প্রথম অংশ অথবা শেষ অংশ তেলাওয়াত করা । রাসুলুল্লাহ (সা) বলেছেন, তোমাদের মাঝে যে তাকে দেখতে পাবে, সে যেন সূরা কাহফের প্রথম আয়াতগুলো তিলাওয়াত করে।

কেন? রাসুলুল্লাহ (সা) কেন আমাদেরকে সূরা কাহফ পড়তে বললেন ? এই বিষয়ে কোন হাদিস নেই, তাই আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি না কেন রাসুলুল্লাহ (সা) সূরা কাহফ পড়তে বলেছেন। কিন্তু আমার যা মনে হয়, তা হলো সূরা কাহফের শুরুতেই আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল আসহাবে কাহফ-এর গল্প আমাদেরকে বলেছেন। আসহাবে কাহফের যুবকেরা কি করেছিলেন? তাঁরা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজেদের দ্বীন বাঁচাতে পালিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁরা ফিতনার মুখোমুখি হন নি। সাধারণত আমরা মুসলিমরা ফিতনাকে মোকাবেলা করি, মুসলমান হিসেবে আমাদের উচিৎ ফিতনার বিরুদ্ধে লড়াই করা। সে জন্যই ইসলামে জিহাদ রয়েছে। কিন্তু আসহাবে কাহফের যুবকেরা পালিয়ে গিয়েছিলেন, তাঁরা তাঁদের সমাজ ত্যাগ করে সেখান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলেন। কেন? কারণ তাঁদের জন্য ফিতনা মহামারি আকার ধারন করেছিল, তাঁদের সেই ফিতনাকে মোকাবেলা করার ক্ষমতা ছিল না। তাঁরা যদি সেই ফিতনার মোকাবেলা করতে যেতেন, তাহলে নিজেদের ঈমানই আর থাকতো না। যখনই আপনার ঈমান হুমকির সম্মুখীন হবে তখনই আপনাকে পালাতে হবে। আমাদের দায়িত্ব নিজেদের ঈমান রক্ষা করা। তাই তাঁরা পালিয়েছিলেন, তাঁরা পালিয়ে চলে গেলেন একটি পাহাড়ে, গুহায়।

সুবহানাল্লাহ, এই ঘটনার সাথে কী সাদৃশ্য দেখুন। রসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, যদি তোমাদের কেউ দাজ্জালের কথা শুন, তবে কখনইতার সাথে দেখা করতে যেওনা । এর কারণ কি? রসুলুল্লাহ (সাঃ) বলছেন,কারন তুমি তার সাথে দেখা করতে যাবে এই ভেবে যে, তুমি মুমিন, তুমি বিশ্বাসী এবং সে তোমার অন্তরে এমন দ্বিধা ঢুকিয়ে দিবে যে তুমি ফিরে আসবে একজন অবিশ্বাসী হয়ে। তারপর রসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেন ,আর মানুষ তার থেকে পালিয়ে পাহাড়ের দিকে দৌড়াতে থাকবে।

ব্যপারটি সেই গুহাবাসী যুবকদের (আসহাবে কাহফ) ঘটনার সাথে মিলে যায়। আল্লাহু আলাম, আল্লাহই ভাল জানেন, আমি যা ভেবেছি। আর এখানে আরেকটি সাদৃশ্য দেখা যায়, এই যুবকেরা পালিয়ে গিয়েছিল কেন? তাদের ধর্মকে রক্ষা করার জন্য, তাদের দ্বীনকে রক্ষা করার জন্য। তারা সংখ্যায় এত কম ছিল যে, সমগ্র সমাজের সাথে লড়াই করার ক্ষমতা তাদের ছিল না। আর দাজ্জালের সময়ে সারা দুনিয়ার মানুষ তার অনুসরণ করবে। আপনি কার সাথে মোকাবিলা করবেন? দাজ্জালের ফিতনা এত ব্যপক আর ভয়ানক হবে যে আপনি নিজে এর থেকে বাঁচতে পারবেন না, দাজ্জালের সাথে যুদ্ধ করা তো দুরের কথা। তাই রসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, পালাও। তার সাথে সাক্ষাত করো না। তার সাথে দেখা করো না।

কারন তার সাথে আছে বড় বড় ফিতনা, বড় বড় ধোঁকা। তাকে বলা হয় আদ দাজ্জাল যার মানে ধোঁকাবাজ, মিথ্যা, মিথ্যাবাদী। পৃথিবীর ইতিহাসে সে সবচেয়ে বড় মিথ্যাবাদী। তার কাছে এমন ক্ষমতা আর ধোঁকাবাজির এমন সব উপায় থাকবে যে রসুলুল্লাহ (সাঃ) তার সাথে বাদানুবাদ করতে পর্যন্ত নিষেধ করেছেন। মানুষকে তার থেকে দূরে থাকতে বলেছেন।

হ্যাঁ, আপনারা বলতে পারেন যে ঐ লোকটি তাহলে কেন দাজ্জালের সাথে কথা বলতে গিয়েছিলো? সেটা একটা বিশেষ ঈমানের উদাহরণ। রসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন সে তার সময়কার সেরা মানুষদের একজন। তার মত ঈমান সবার থাকবে না। ফলে সাধারণ মানুষ তার ফাঁদে পড়ে যাবে। সুতরাং যদি আপনি আপনার ঈমানের নিরাপত্তা নিয়ে ভয়ে থাকেন তবে তার থেকে দূরে থাকুন।

অপর এক হাদীসে সুরাতুল কাহফের শেষ অংশের কথা উল্লেখ আছে। মানে দুটো বর্ণনা আছে। একটি বর্ণণা বলছে, সুরা কাহফের প্রথম অংশের কথা। আর একটি বর্ণনা বলছে শেষ অংশের কথা।

তার থেকে বাঁচার চতুর্থ উপায় হল তাকে এড়িয়ে চলা। সুনান আবু দাঊদে এটা আছে। রসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, যদি তোমরা শুনে থাক যে কোথাও দাজ্জালকে দেখা গিয়েছে তবে তোমরা তার থেকে দূরে চলে যাও। কারণ আল্লাহর শপথ একজন মানুষ এমন হবে যে কিনা নিজেকে বিশ্বাসী ভেবে তার সাথে দেখা করতে যাবে আর শেষ অবধি সেদাজ্জালকেই অনুসরণ করবে।

অর্থাৎ দাজ্জাল থেকে নিরাপদ থাকার চারটি উপায় আমরা জানলাম-

১. ঈমান,

২. ইসতিয়াযা অর্থাৎ আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করা,

৩. সুরাতুল কাহফ তিলাওয়াত করা,

৪. তার থেকে দূরে দূরে থাকা।

আর একটি কথা, যেহেতু রসুলুল্লাহ (সাঃ) সুরা কাহফের প্রথম দশ আয়াতের কথা বলেছেন তাই আয়াতগুলো মুখস্থ থাকা আমাদের জন্য জরুরী। আর কেউ যদি সম্পূর্ণ সুরা মনে রাখে তবে উত্তম।

সবশেষে দাজ্জালের মৃত্যু নিয়ে কিছু কথা। মিথ্যা যত বড়ই হোক, যত দীর্ঘস্থায়ীই হোক, তা একদিন-না-একদিন অবশ্যই প্রকাশিত হবে। দাজ্জালের কাছে যত ফিতনা ই থাকুক না কেন।, তারও একদিন সমাপ্তি হবে। মিথ্যা কখনই চিরকাল টিকে থাকতে পারে না।

আদ দাজ্জালের সম্পূর্ণ ব্যাপারটাই মিথ্যা আর ধোঁকা নিয়ে। তার মিথ্যা আর ধোঁকা তাকে এতদুর নিয়ে আসবে এবং তারপর তার পতন হবে। দাজ্জালের ফিতনা সারা পৃথিবীময় ছড়িয়ে পড়বে আর প্রায় সবাই তার অনুসরণকারী হয়ে যাবে। দাজ্জাল মানুষের এই পরিমাণ ক্ষতির কারণ না হয়ে ধ্বংস হবে না। সে হবে অপ্রতিরোধ্য।[weak]কেউ তার সাথে লড়াই করার ক্ষমতা রাখবে না।

এমনকি দাজ্জালের সাথে মুখোমুখি হবার কোন সামর্থ্য ইমাম আল মাহদীর ও থাকবে না। ইমাম মাহদী ঈমানদারদের নিয়ে জেরুজালেমে তাদের দুর্গের মধ্যে অবস্থান করবেন। তার থেকে দূরে থাকবেন। তাঁরা ততদিন পর্যন্ত দাজ্জালের সম্মুখীন হবেন না যতদিন পর্যন্ত না ঈসা ইবন মারইয়াম(আঃ) পুনরায় আবির্ভূত না হবেন। যেমনি আল্লাহ আদ দাজ্জালকে অলৌকিক ক্ষমতা দিবেন তেমনি আল্লাহ সায়্যিদিনা ঈসা(আঃ) কে আলৌকিক ক্ষমতা দিবেন। যার সাহায্যে তিনি তাঁর দৃষ্টি দ্বারা আদ দাজ্জালকে ধ্বংস করে দিবেন।

একটি বর্ণনা বলছে সায়্যিদিনা ঈসা(আঃ) তাকে ধ্বংস করবেন তাঁর চোখের দৃষ্টি দ্বারা। আর একটি বর্ণনায় উল্লেখ আছে তাঁর নিঃশ্বাসের কথা। আল্লাহু আলাম। এটি দাজ্জাল কে গলিয়ে ফেলার জন্য যথেষ্ট হবে, যেমনকরে একখণ্ড বরফ গলে যায়। আর তা হল একটি অলৌকিক ক্ষমতা যা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা সায়্যিদিনা ঈসা(আঃ) কে দান করবেন।

সহীহ মুসলিম এর একটি হাদীস – রসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, পৃথিবীতে দাজ্জালের অবস্থানকাল হবে চল্লিশ।… অতঃপর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা মার‍ইয়াম পুত্র ঈসাকে প্রেরণ করবেন। তিনি তাকে খুঁজে বের করবেন এবং হত্যা করবেন। রসুলুল্লাহ (সাঃ) আরো বলেছেন, সা(আঃ) দেখতে হবেনঊরওয়া ইবন মাসউদ এর মত। ঊরওয়া ইবন মাসউদ রাসূল্লুলাহ (সাঃ) এর সময়কার একজন কেউ। ইমাম আহমাদ একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন – রসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, সা (আঃ) আদ দাজ্জালকে বাব এ লুদ্দ নামক স্থানে হত্যা করবেন। আর এটি বর্তমান ফিলিস্তিনে অবস্থিত। এভাবেই দাজ্জাল অধ্যায়ের সমাপ্তি হবে।

 

কিয়ামতের (বিচার দিবসের) দ্বিতীয় বড় আলামত হল সায়্যিদিনা ঈসা(আঃ) এর পুনরায় আগমন।  আমরা দাজ্জাল নিয়ে আলোচনা করেছি। ইনশাআল্লাহ আমরা এখন ক্রমানুসারে দুই নাম্বার লক্ষণ নিয়ে কথা বলব। আর তা হল সায়্যিদিনা ঈসা(আঃ) এর পুনঃআবির্ভাব।

এর সূত্রপাত হবে সায়্যিদিনা ঈসা(আঃ) দামেস্কে অবতরণ করার মধ্য দিয়ে। রসুলুল্লাহ (সাঃ) সেই জায়গা নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করেছেন, …দামেস্কের পূর্বদিকের সাদা মিনারে…   [সহীহ মুসলিম, ৭০১৫]

রসুলুল্লাহ (সাঃ) যখন এই কথা বলছিলেন তখন দামেস্কে কোন মাসজিদ ছিলনা। তখনও পর্যন্ত সেখানে কোন মুসলিমও ছিলনা। এটি ছিল রোমান সাম্রাজ্যের অংশ। তারা খ্রিস্টান ছিল। অথচ রসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, তিনি দামেস্কের পূর্বে সাদা মিনারের পাশে অবতরণ করবেন।

আল মাসজিদুল আমউই দামেস্কের বড় মাসজিদগুলোর একটি। আর মুসলিম ইতিহাসে এই মাসজিদ একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। মুসলিম খিলাফাহর রাজধানী দামেস্কে স্থানান্তরিত হয়েছিল। এর সময়কাল ছিল প্রায় একশ বছর। এটি  ছিল খিলাফাহ আল আমাউইয়্যা এর যুগে। আর তখনকার গ্র্যান্ড মাসজিদ ছিল, জাম আল আমাউই , বা আমউই মাসজিদ। তখন এর রঙ সাদা ছিল না।

ইবন কাসীর বলেন, কয়েক শতাব্দী পর ঐ মাসজিদ এর মিনারগুলো পুনারায় নির্মাণ করা হয়। আর এসময় সেগুলো সাদা রঙ করা হয়। এই পুনর্নির্মাণের খরচ বহন করেছিল খিস্টানরা। এখানে ব্যবহার করা হয়েছিল খ্রিস্টানদের টাকা । কিন্তু তিনি বলেননি কেন তা করা হয়েছিল। তখনই এই মিনারের রঙ সাদা করা হয়। আজ তা সাদাই আছে।

সুতরাং আমরা দেখতে পাচ্ছি একসময় সেখানে কোন মাসজিদ ছিল না। পরে একটা সময় আসল যখন সেখানে মাসজিদ হয় তখন তার রঙ সাদা ছিল না। পরবর্তীতে তার সাদা রঙ করা হয়। যা কিনা আজও আছে। এখন তা সাদা রঙ অথবা মার্বেল পাথরের কারনে সাদা দেখায়। সুবহানাল্লাহ সেখানেই সায়্যিদিনা ঈসা(আঃ) এর আগমন কথা। সেই মিনারের অর্থায়নও করেছিল খ্রিস্টানরাই। এটা নিঃসন্দেহে আশ্চর্যজনক একটি ঘটনা। আমরা এই ঘটনার আলোকে খ্রিস্টানদেরকে দাওআহও করতে পারি। রঙের সাথে সম্পর্কিত আরেকটি ঘটনা আছে, এটি আল হারাম আন-নাওয়াউয়ী।

মদিনার মাসজিদ, আল হারাম আন নাবাউঈ; রসুলুল্লাহ (সাঃ) এর সময় এটি নির্মাণ করা হয়েছিল কাদামাটি দিয়ে। উসমান (রাঃ) এর খিলাফতের সময় এটি পুনর্নির্মাণের আগে পর্যন্ত তা এমনি ছিল। মুসলিম ইতিহাসের বিভিন্ন যুগে এটি নতুন করে নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু এটির রঙ কখনও সাদা ছিল না। এটি সাদা করা হয় সর্বশেষ নির্মাণের সময়, বর্তমান সৌদি শাসনামলে। এই মাসজিদের মিনার গুলোতে মার্বেল বসানোর কারনে তা সাদা দেখায়। মার্বেল নিজে একেবারে সাদা নয়। কিছুটা হাল্কা সাদা। মার্বেল কিছুটা প্রতিফলন ধর্মী। আর তাই মার্বেল মক্কায় অনেকটা ধূসর বর্ণের দেখায়। যা কিনা মদিনায় যথেষ্ট সাদা।

আমি এটা বলছি না যে মাসজিদ পুনর্নির্মাণের সময় এই হাদীস মাথায় রেখেই কাজ করা হয়েছিল। বরং একটি ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি এটি এজন্য করেছে যাতে মাসজিদ কে আরো সুন্দর লাগে। কিন্তু রসুলুল্লাহ (সাঃ) এর একটি হাদীস আছে যে, যেখানে তিনি বলেন যে, আদ দাজ্জাল উহুদ পাহাড়ের উপর দাড়িয়ে থাকবে। কারন সে মাদিনায় প্রবেশ করতে পারবে না। আর সে তার বাহিনীকে বলবে ,তোমরা কি ওই সাদা প্রাসাদ কে দেখতে পাচ্ছ? ওটা হল মুহাম্মাদের প্রাসাদ। (সাঃ)। অতঃপর সে মাসজিদ আন নাবাঊইর দিকে দেখাবে। খুবই আশ্চর্যজনক ব্যাপার।

সা (আঃ) এর আগমনের বর্ণনাগুলো মুতাওয়াতির। মুতাওয়াতির মানে হল বহুবার বর্ণিত হয়েছে এমন হাদীস এবং তার সত্যতার ব্যাপারে মনে কোন সংশয় সন্দেহের অবকাশ থাকে না। কারণ হাদীসের নামে অনেক জাল বর্ণনা প্রচলিত আছে। অনুরূপভাবে আবার কিছু আছে দুর্বল বর্ণনা। যেগুলোকে যয়ীফ বলা হয়। এর থেকে উপরের স্তরে আছে হাসান। আর তার উপরে আছে সহীহ। অর্থাৎ নির্ভরযোগ্য। সবচেয়ে শক্তিসালী সহীহ বর্ণনা হল মুতাওয়াতির।

মুতাওয়াতির বর্ণনা এমন যা হল নিশ্চিত জ্ঞান। এত বার এগুলো বর্ণনায় এসেছে যে, দ্বিধা দ্বন্দের কোন অবকাশ নেই। আমাদের বিশ্বাস তাই এমন যে মারইয়াম পুত্র সায়্যিদিনা ঈসা(আঃ) এর আগমন একটি নিশ্চিত ঘটনা। মানে আমরা বলি না যে, ঈসা(আঃ) এর আগমনের সম্ভাবনা ষাট বা সত্তর পারসেন্ট। না, এটি এমন একটি বিষয় যা প্রতিটি মুসলিম বিশ্বাস করে। এখানে মত পার্থক্যের কোন জায়গা নেই। কুরআনের আয়াত এবং অনেক হাদীস দ্বারা এই বিষয় পরিস্কার হয়ে গিয়েছে যে ঈসা (আঃ) ফিরে আসবেন।

কুরআনের আরেকটি আয়াত আছে; আল্লাহ বলেন, আর আহলে কিতাবদের মধ্যে এমন একজনও হবে না, যে তার মৃত্যুর পূর্বে তাঁর  উপর ঈমান আনবে না। এবং কিয়ামতের দিন তিনি তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ দিবেন। [৩:১৫৯ ]

আহলে কিতাবদের প্রত্যেকে, ইহুদী-খ্রিষ্টানদের প্রত্যেকে তাঁর উপর ঈমান আনবে। আর তিনি তাদের ব্যাপারে সাক্ষী হবেন।

ইবনে জারীর আত তাবারীর একটি নির্ভরযোগ্য বর্ণনা আছে যার বর্ণণাসুত্র ইবনে আব্বাস পর্যন্ত পৌছে। ইবনে আব্বাস (রাঃ) এই আয়াতের তাফসিরে বলেন, এখানে তাঁর মৃত্যুর পূর্বে বলতেসা(আঃ) এর মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে। আর ইবন জারীর আত তাবারী এর সনদকে সহীহ বলেছেন। অতঃপর হাসান বাসরী(রঃ) বলেন, এটা (অর্থাৎ আহলে কিতাবদের ঈমান আনার ঘটনা) ঈসা(আঃ) এর মৃত্যুর পূর্বে। আল্লাহর কসম তিনি জীবিত। অতঃপর তিনি আবির্ভূত হবেন। আর তারা সবাই তাঁর উপর ঈমান আনবে।

সুন্নাহ থেকে আমরা তাঁর সম্পরকে কিছু হাদীস পাই যা মুত্তাফাক আলাইহি। মুত্তাফাক আলাইহি হল এমন সব হাদীস যেগুলো বুখারী এবং মুসলিম উভয়টাতে বর্ণনা করা হয়েছে। রসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, যার হাতে আমার জীবন তাঁর শপথ, শীঘ্রই তোমাদের মাঝে মারইয়াম পুত্র আবির্ভূত হবেন এবং তোমাদের মাঝে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করবেন ;তিনি ক্রুশ ভেঙ্গে ফেলবেন, শুকর হত্যা করবেন এবং তখন কোন জিযইয়া প্রথা থাকবে না। সম্পদের এত প্রাচুর্য হবে যে কেউ তা গ্রহণ করবে না। আর একটি সাজদাহ এর গুরুত্ব মানুষের কাছে দুনিয়া ও দুনিয়ার মাঝে যা কিছু আছে তার থেকে বেশি হবে। [সহীহ বুখারী, চতুর্থ খণ্ড, হাদীস নং ৬৫৭]

অর্থাৎ ঈসা(আঃ) আসবেন, ক্রুশ হাতে নিবেন এবং ভেঙ্গে ফেলবেন। এর দ্বারা তাঁর শিরকের প্রতি অস্বীকৃতি জ্ঞাপনই বুঝা যায়, যা তাঁর নামে চলে আসছে। কারন তাকে আল্লাহর সাথে খোদা হিসেবে শরিক করা হয়ে থাকে। তিনি এটাকে মিথ্যা প্রমাণ করবেন। আর তারপর তিনি শুকর হত্যা করবেন। তিনি পৃথিবীকে শুকর থেকে মুক্ত করবেন। তিনি জিযিয়া বন্ধ করে দিবেন। জিযিয়া হল ট্যাক্স মানি বা কর, যা ইহুদী এবং খ্রিস্টানরা মুসলিম খিলাফতের অধীনে নিরাপত্তার বিনিময়ে সরকারকে দিয়ে থাকে। যখন তারা মুসলিম খিলাফাহর নাগরিক হিসেবে বসবাস করে তারা ধর্ম পালনের স্বাধীনতা পায়। আর যেহেতু যাকাত মুসলিমদের জন্য একটি ইবাদাহ, তাই অমুসলিমদেরকে যাকাত দিতে বলা হয় না। এটা ধর্মীয় স্বাধীনতার একটি অংশ। যেহেতু তারাও মুসলিমদের মতই সুযোগসুবিধা ভোগ করে থাকে তাই তাদেরকেও কিছু অর্থ ব্যয় করতে হয়। সেটাই জিযিয়া। ঈসা(আঃ) তাদের কাছ থেকে আর জিযিয়া গ্রহণ করবেন না। তার মানে তিনি মানুষকে কেবল দুইটির একটি বেছে নিতে বলবেন। হয় ইসলাম আর না হয় যুদ্ধ। জিযিয়া দিয়ে অমুসলিম থাকার কোন উপায় থাকবে না। তিনি মানুষের কাছ থেকে গ্রহণ করবেন শুধু ইসলাম। নতুবা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবেন।

রসুলুল্লাহ (সাঃ) আরও বলেন যে তখন, সম্পদ এতো বেশি হবে যে, মানুষ পাশ দিয়ে হেঁটে যাবে অথচ কেউ তা ছুঁয়েও দেখবে না। কারন মানুষের কাছে তা যথেষ্ট পরিমাণ থাকবে। কেউ ভিক্ষা করবেনা, কেউ টাকার জন্য তার সম্মান নষ্ট করবেনা। কারন সবার কাছেই যথেষ্ট পরিমাণে সম্পদ থাকবে। আর যেহেতু কিয়ামত খুব নিকটে থাকবে, কারও মনে সম্পদের লোভ থাকবে না। আর এজন্যই মানুষের কাছে একটি সাজদাহর গুরুত্ব হবে এই দুনিয়া ও দুনিয়ার মাঝে যা কিছু আছে তার থেকে বেশি।

রসুলুল্লাহ (সাঃ) অপর এক মুত্তাফাক আলাইহি হাদীসে বলেন, যখন তোমাদের মাঝে তোমাদের ইমাম থাকবে আর মারইয়াম পুত্র, ঈসা(আঃ) তোমাদের মাঝে আবির্ভূত হবেন, তখন তোমাদের অবস্থা কী হবে?

সা(আঃ) দামেস্কের মাসজিদে অবতরণ করবেন এবং হেঁটে মাসজিদের ভিতরে ঢুকবেন। তখন মুসলিমরা সালাতের জন্য প্রস্তুত। সালাতের ইকামাহ হয়ে গেছে। ইমাম মাহদী সায়্যিদিনা ঈসা(আঃ) কে দেখতে পাবেন এবং তিনি পিছনে সরে আসবেন। তারপর তিনি তাঁকে সালাতের ইমামতি করার জন্য বলবেন। কিন্তু সায়্যিদিনা ঈসা(আঃ) আল মাহদীকে বলবেন যে যেহেতু এই ইকামাহ আপনার জন্য দেয়া হয়েছে, কাজেই সালাত আপনিই পড়াবেন।

আর এটি এই উম্মাহর জন্য জন্যে একটি সম্মানের ব্যাপার যে, সায়্যিদিনা ঈসা ইবন মারইয়াম(আঃ), মুহাম্মাদ(সাঃ) এর অনুসারীদের মধ্যে একজনের ইমামতিতে সালাত আদায় করবেন। অবশ্য এই সালাতের পর ঈসা(আঃ) দায়িত্ব নিবেন।

রসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, আমার আর তার মাঝে কোন নবী নেই, তিনি ঈসা(আঃ)। তিনি আবার আসবেন। যখন তোমরা তাকে দেখবে তাকে চিনে রেখো : মধ্যম লম্বা একজন মানুষ, লালচে এবং সুন্দর, দুইটি পাতলা হলুদ রঙের জামা পরা, দেখে মনে হবে যেন তার মাথা থেকে পানির ফোটা পড়ছে, যদিও তার মাথা থাকবে শুকনা… [আবু দাঊদ : বই-৩৭, হাদিস নং-৪৩১০]

এভাবেই তিনি আসবেন। তার দুই হাত থাকবে ফেরেশতাদের ডানার উপর।

তিনি এসে যখন মুসলিমদের নেতা হবেন তিনি কোন আইন প্রতিষ্ঠা করবেন? কারণ তিনি যখন বনী-ঈসরাইলদের মাঝে এসেছিলেন তিনি মুসা(আঃ) এর আইন, আত তাওরাত অনুসরণ করেছেন। আর এর পর যখন তাঁর আবার আগমন হবে তিনি মুহাম্মাদ(সাঃ) এর আইন প্রতিষ্ঠা করবেন, অর্থাৎ আল কুরআন।

আসলে সবই ইসলাম। মুসা(আঃ) এর বাণী ছিল ইসলাম, ঈসা(আঃ) এর বাণী ছিল ইসলাম, মুহাম্মাদ(সাঃ) এর বাণীও ইসলাম। কিন্তু কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ের বিস্তারিত বর্ণনায় কিছুটা পার্থক্য ছিল। যাদের প্রতি পথনির্দেশ দেয়া হয়েছিল, সেইসব মানুষদের গ্রহণযোগ্যতার উপর ভিত্তি করে এই ভিন্নতা ছিল। কিন্তু মূল কথা অভিন্ন। যখন ঈসা(আঃ) আসবেন তিনি মুহাম্মাদ(সাঃ) এর আইন অনুসরণ করবেন। সুবহানাল্লাহ, এটাও মুহাম্মাদ(সাঃ) এর জন্য সম্মানের যে ঈসা(আঃ) তাঁকে অনুসরণ করবেন।

আর রসুলুল্লাহ (সাঃ) আরেক হাদীসে বলেন, …যদি আজকে মুসা(আঃ) বেঁচে থাকতেন তবে তিনি আমাকে অনুসরণ করতেন …   [তিরমিযি ৬০]

এখন প্রশ্ন আসতে পারে যে, মুহাম্মাদ(সঃ) এর নীতি ছিল জিযিয়া, অর্থাৎ যে কর মুসলিম শাসনে বসবাসকারী সকল ইহুদী বা খ্রিষ্টানকে প্রদান করতে হয়, তা গ্রহণ করা। ঈসা(আঃ) কেন তা আর গ্রহণ করবেন না? এর কারণ হল, রসুলুল্লাহ(সঃ)ই তাঁর বলে গিয়েছেন, জিযিয়া ততদিন পর্যন্ত চলতে থাকবে যতদিন ঈসা(আঃ) এর (আগমনের) সময় না আসে, ঈসা(আঃ) এর সময়ের পর কোন জিযিয়া থাকবে না। সুতরাং জিযিয়া গ্রহণের নীতি শুধুমাত্র ঈসা ইবন মারঈয়াম আসার সময় পর্যন্ত বহাল থাকবে, এর পর তার কোন বৈধতা থাকবে না। এবং ঈসা(আঃ) যখন বেঁচে থাকবেন দুনিয়ায়, তখন তিনি মুসলিমদের সাথে হজ্জ্ব পালন করবেন। সহিহ মুসলিমে বর্ণীত হাদিস অনুসারে, মুহাম্মাদ(সঃ) বলেছেন, যার হাতে আমার আত্মা তাঁর শপথ, ঈসা ইবন মারঈয়াম ফাজ্জা-রওহায়(মক্কার নিকটবর্তী এক স্থানে) হজ্জ্বের তাহলীল(সঙ্কল্প) করবেন এবং তিনি হজ্জ্ব বা উমরাহ্‌ উভয়ই সম্পাদন করবেন। সুতরাং তিনি এই উম্মাহর মুসলিমদের সাথে হজ্জ্ব বা উমরাহ্‌পালন করবেন।

সে সময় দুনিয়ার অবস্থা কেমন হবে?

সহিহ মুসলিম এর হাদিস অনুসারে, ইয়াজুজ ও মাজুজ এর সময় এর পরে আল্লাহ একটি বৃষ্টি নামাবেন। সেই বৃষ্টি এতটাই ব্যাপক হবে যে, কোন বাড়ি-ঘর, তা সেটা যা দিয়েই তৈরি হোক না কেন, এর হাত থেকে রক্ষা পাবে না। এটা পৃথিবীকে পরিস্কার করে ফেলবে এবং আয়নার মত করে ছেড়ে দিবে। এখানে আয়নার মত বলতে এমন হতে পারে যে ভূপৃষ্ঠে এত পানি জমা হবে যে উপর থেকে দেখে আয়নার মত মনে হবে, কিংবা এমনও হতে পারে যে পৃথিবী এতটাই পরিস্কার হবে যে তা আয়নার মত চকচক করবে। এই বৃষ্টির পানি ইয়াজুজ আর মাজুজদের দেহ ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। এবং আল্লাহ পৃথিবীকে আদেশ করবেন এর ফল উৎপাদন করতে এবং এর বরকতসমূহ ফিরিয়ে দিতে। সুতরাং বরকতসমূহ আসলেই পৃথিবীর অভ্যন্তরেই ছিল, তবে আমাদের পাপকর্মের ফলে তা লুকিয়ে ছিল যা পরবর্তীতে আল্লাহ তায়ালার আদেশে বেরিয়ে আসবে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কুর’আনে বলেন, জমিন ও সমুদ্রে দূষণের উদ্ভব ঘটেছে মানুষের হাত যা করেছে তার কারণে। অর্থাৎ বর্তমানে এই মাটি ও পানির দুষনের জন্য আমাদের কর্মকাণ্ড অর্থাৎ পাপকর্মই দায়ী। কিন্তু ঈসা(আঃ) এর সময় আল্লাহ জমিনকে এর বরকতসমূহ প্রকাশ করে দিতে বলবেন।

সে সময় একদল মানুষ একটি আনার ফল থেকে সবা মিলে ভাগ করে খাবে। একটিমাত্র ফল, এতটাই বড় হবে যে তা একদল মানুষের জন্য যথেষ্ট হবে। এবং এর খোসা এত বড় হবে যে তা তাদের ছায়া দিবে, ছাউনি হিসেবে কাজ করবে। এবং আল্লাহ দুধকে বরকত দিবেন। ফলে একটি মাদী উটের দুধ সম্পূর্ণ একটি গোত্রের জন্য যথেষ্ট হবে, একটি গাভীর দুধ সম্পূর্ণ একটি বংশের জন্য যথেষ্ট হবে, এবং একটি ছাগীর দুধ একটি বড় পরিবারের জন্য যথেষ্ট হবে। পৃথিবী তখন এতটাই বরকতময়হয়ে যায়।

মুসনাদে আহমাদ হতে বর্ণীত হাদিস অনুসারে, নবী-রাসূলগন সৎভাই। তাদের দ্বীন এক, তবে মা ভিন্ন। অন্যভাবে বলতে গেলে সকল আম্বিয়াই ভাই, তাদের দ্বীন একই, ইসলাম; কিন্তু নীতি অর্থাৎ শরীয়াহ ভিন্ন। এবং আম্বিয়াগণের মাঝে ঈসা(আঃ) মুহাম্মাদ(সঃ)-এর সবচেয়ে নিকটবর্তী, কারণ তাদের মাঝে আর কোন নবী আসেননি।

মুহাম্মাদ(সঃ) ঈসা(আঃ) এর সম্পর্কে কিছু বর্ণনা দিয়ে গিয়েছেন। ঈসা(আঃ) এর চুল ঘন কালো হবে এবং এমন হবে যেন তা দেখে ভেজা মনে হবে যদিও তা আসলে শুষ্ক। কিছু মানুষের চুল এমন চকচকে হয় যেন, দেখে মনে হয় যে তা ভেজা, যদিও আসলে তা শুকনা। ঈসা(আঃ) এর চুলও তেমনই হবে। এবং তিনি ক্রুশকে গুড়িয়ে দিবেন। অন্য এক হাদিসেও আছে যে তিনি ক্রুশ কে ভেঙ্গে দিবেন। এবং তিনি শূকর মেরে ফেলবেন, দুনিয়া থেকে শূকর সরিয়ে ফেলবেন। তিনি জিযিয়া পরিত্যাগ করবেন এবং সমগ্র মানবজাতিকে তিনি ইসলামের পথে ডাকবেন। ইসলাম ব্যাতিত সেসময় বিরাজকারী সকল ধর্ম বিতাড়িত হবে, আল্লাহ সে ধর্মগুলোকে ধ্বংস করে দিবেন।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা প্রদত্ত ঈসা(আঃ) এর একটি বিশেষ মর্যাদা হচ্ছে তাঁর হাত ধরেই শেষ বিজয় অর্থাৎ ইসলামের চূড়ান্ত বিজয় ঘটবে। তাঁর আরও একটি মর্যাদা হচ্ছে যে, তাঁর সময়ই দাজ্জাল এর পতন ঘটবে এবং পৃথিবীতে শান্তি নেমে আসবে। শান্তি তখন আর কাঙ্ক্ষিত বস্তু হবে না, বরং সকলের মাঝেই শান্তি বিরাজ করবে। যেমন রসুলুল্লাহ(সঃ) বলেছেন, সিংহ ও উট একত্রে সহাবস্থান করবে, বাঘ ও গরু একত্রে সহাবস্থান করবে, নেকড়ে ও ছাগল একত্রে সহাবস্থান করবে এবং বাচ্চারা বিষধর সাপ নিয়ে খেলবে। অর্থাৎ এতটাই সুখ-শান্তি বিরাজ করবে যে কেউ কারো ক্ষতি করতে চাইবে না। রসুলুল্লাহ(সঃ) আরও বলেন, তিনি(ঈসা) ৪০ বছর দুনিয়ায় থাকবেন, তারপর তিনি মারা যাবেন এবং মুসলিমরা তাঁর জানাজা পড়বে। তাঁকে এই দুনিয়াতেই মারা যেতে হবে। কারণ আল্লাহ তাঁকে মাটি থেকে তৈরি করেছেন। তাই এই দুনিয়ায় জন্ম হয়েছে তাঁর, এই দুনিয়াতেই তাঁকে মারা যাবেন। ঈসা(আঃ) এখনো মারা যাননি, ইসলামের চূড়ান্ত বিজয়ের নেতৃত্বের জন্য আল্লাহ তাঁকে পুনরায় প্রেরণ করবেন। সুবহানআল্লাহ, এটা একটি মহিমান্বিত উম্মাহ, কারণ এটা একজন রাসূল এর হাত ধরেই এর সূচনা এবং শেষও হবে একজন রাসূল দ্বারা। ঈসা(আঃ) মারা যাবেন এবং মুসলিমরা তাঁর জানাজার নামাজ আদায় করবেন। হাদিসের বর্ণনা অনুসারে তিনি ৪০ বছর বাঁচবেন। তবে আর একটি হাদিস অনুসারে দুনিয়ায় তাঁর অবস্থানের সময় ৭ বছর এবং উভয় হাদিসই সহিহ কেননা এগুলি সহিহ মুসলিমে বর্ণীত। আলিমগণ এটি ব্যাখ্যা করে বলেছেন যে তাঁর প্রকৃত আয়ু ৪০ বছর। এর আগে তিনি ইতোমধ্যে ৩৩ বছর বেঁচেছিলেন এবং এরপর যখন আসবেন তখন বাকি ৭ বছর এই উম্মাহ এর সাথে কাটাবেন। রসুলুল্লাহ(সঃ) বলেন, এই ৭ বছরে কোন ২ জন মানুষের মাঝে কোন প্রকার সমস্যা বা মতানৈক্য ঘটবে না। এতটাই শান্তি বিরাজ করবে। তিনি আরও বলেন, অতঃপর আশ-শাম হতে একটি প্রবল বায়ু বইবে। এটি সকল বিশ্বাসী অর্থাৎ মুমিনদের জীবন কেড়ে নিবে। যাদের অন্তরে দানাপরিমাণ ঈমান থাকবে, তারাও মারা যাবে। এটাই এই দুনিয়ার গল্পের একরকম সমাপ্তি বলা যায়। যে গল্প শুরু হয়েছিল আদম(আঃ) থেকে তার শেষ ঘটবে ইসলামের চূড়ান্ত বিজয় দ্বারা। সুতরাং দুনিয়ার ইতিহাসের শেষ অধ্যায় হল ইসলামের বিজয় এবং আল্লাহ বলেন, এটি(ইসলাম) অন্য সকল ধর্মের ওপর জয়লাভ করবে

আল্লাহ আরও বলেন, পৃথিবীর মালিকানা আল্লাহর হাতে এবং তিনি একে যাকে ইচ্ছা তাকে দান করবেন এবং সবকিছুর শেষে এর ওপর কর্তৃত্ব হবে বিশ্বাসীদের। সত্য ও মিথ্যার মাঝে সর্বদা একটি সংগ্রাম চলে আসছে আদম(আঃ) এর সময় থেকে। কার্ল মার্ক্স যেমন বলেছিলেন, পৃথিবীর ইতিহাস অর্থনৈতিক ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করা যায়। এটা মূলত সম্পদের অপ্রতুলতার কারণে মানুষের মাঝে দ্বন্দ্ব। কিন্তু এভাবে আসলে ইতিহাসকে বর্ণনা করা যায় না। প্রকৃত ইতিহাস হচ্ছে সত্য ও মিথ্যার মাঝে দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্ব বা যুদ্ধ অবিরাম হয়ে চলেছে এবং অসংখ্য সাফল্য-ব্যর্থতায় পরিপূর্ণ। কখনো বিশ্বাসীগণ জয়লাভ করে, কখনো বা তারা পরাজয়লাভ করে। কখনো এই উম্মাহ সাফল্যমণ্ডিত হয়, কখনো বা পরাজয়ে পর্যবসিত হয়। তবে শেষ ভালো যার, সব ভালো তার, আর এই শেষ সাফল্য হবে ইসলামের। ইসলাম সকল ধর্মের ওপর নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করবে, এবং সেটা হবে এই পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বরকতময় সময়।

সে সময়ের কথা রসুলুল্লাহ(সঃ) বলেছেন, যদি তুমি কঠিন পাথরের ওপর বীজ ছুঁড়ে দাও, তবু এটা বেড়ে উঠবে। শুধু কিছু বীজ পাথরের ওপর ছুঁড়ে দিয়ে যদি তাদের সেখানে রেখে দেওয়া হয়, তাহলে তা গাছ হিসেবে বেড়ে উঠবে, এতটাই বরকতমণ্ডিত হবে সে সময়। এবং এটাই পৃথিবীর ইতিহাসের শেষ। অন্যভাবে বলতে গেলে এটাই সত্য ও মিথ্যার যুদ্ধের শেষ। এরপর বিশ্বাসীদের জীবন কেড়ে নেওয়া হবে, অতঃপর যারা অবশিষ্ট থাকবে তারা হল মুনাফিক এবং সবচেয়ে নিকৃষ্ট শ্রেণীর মানুষ। রসুলুল্লাহ(সঃ) বলেন, তারা হবে অসৎ এবং তারা নিজেদের মধ্যে এমনভাবে সঙ্গমে মেতে উঠবে যেমনভাবে গাধারা(বা অন্য কোন পশু) করে থাকে। এবং এরাই হল তারা যাদের ওপর অন্তিম প্রহর আগমন করবে। শেষবিচারের দিন এমন মানুষের ওপর সংঘটিত হবে। আর আল্লাহই ভালো জানেন হয়তো এমন সময় ৪০ বছর বা এরকম কিছু সময় ধরে চলবে যখন পৃথিবীর বুকে কোনপ্রকার ঈমান থাকবে না, দুর্নীতি, বিপথগামিতা ছেয়ে যাবে, মানুষ একে অপরকে হত্যা করবে, সবরকম অসৎকর্মসমূহ ছড়িয়ে পড়বে এবং এরপরই বিচারদিবস এর আগমন ঘটবে এবং এটাই হবে পৃথিবীর শেষ।