পরকালের পথে যাত্রা – পর্ব ১২ – কেমন হবে কাফেরদের কিয়ামত

সেই দিনের গুরুত্ব তার রূপরেখাঃ

আল আখিরাহ!
 আপনি যদি দুনিয়ার তুলনায় আখিরাতের গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে চান, তাহলে একটি সহজ গাণিতিক সমীকরণ ব্যবহার করতে পারেন। কার গুরত্ব বেশি , কার অনুপাত বেশি সেটা জানার জন্যে। 
আমরা এই দুনিয়ায় কত বছর বাঁচব- ৬০, ৭০ কিংবা ধরে নেই ১০০ বছর ? এদিকে আখিরাতের জীবন তো অসীম। যার শেষ নেই। এখন, আসুন উভয়ের মধ্যে তুলনা করা যাক।  আপনি যদি ১০০ কে অসীম দিয়ে ভাগ দেন তাহলে কি পাবেন? শুণ্য।

 

সুতরাং যখন আখিরাতের সাথে দুনিয়ার তুলনা করা হয়, দুনিয়ার গুরুত্বও শূন্য। 
কাজেই আখিরাতের তুলনায় দুনিয়ার গুরুত্ব শূণ্য।

সাহাবারা (রা) এই বিষয়টি কোনো অঙ্ক না কষেই বুঝতেন। তাঁরা দারস দিতেন আখিরাত নিয়ে,কথা বলতেন আখিরাহ নিয়ে, তাঁরা আখিরাতের কথা সর্বদা স্মরণে রাখতেন, একজন অপরজনকে স্মরণ করিয়ে দিতেন। 
রাসুলুল্লাহ সা)ও তাঁদের আখিরাতের বিষয়ে ভাষণ দিতেন। 

কোরআনুল করিমও আখিরাত নিয়ে বিশদ বর্ণনা দিয়েছে।

এখন আমরা কথা বলব কিয়ামাহ নিয়ে, ইয়াওমুল কিয়ামাহ !

আমরা আলোচনা করেছি মৃত্যু নিয়ে, বারযাখের জীবন (কবর) নিয়ে এবং এখন আমরা আলোচনা করছি কিয়ামাহ নিয়ে।
 কিয়ামাহ হবে একটা মাত্র দিনে, শুধুমাত্র একটা দিন। কিন্তু তাও এর আলোচনা আমরা বেশ কিছুটা সময় নিয়ে করব কারণ এটা দিন হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অনেক দীর্ঘ। এটি ৫০,০০০ বছর দীর্ঘ।

 

একবার একজন, আরাবি, একজন বেদুইন- যে রাসুলুল্লাহ সা. এর সামনে একবার দুয়া করেছিলেন এবং এই দুআ তাঁকে (সা.) অনেক প্রভাবিত করেছিল, তিনি এটি খুব পছন্দ করেছিলেন। এর মধ্যে অনেক বিচক্ষণতাপূর্ণ শিক্ষা ছিল।

দুয়াটি অনেক দীর্ঘ, আমরা এর শেষের অংশ তুলে ধরছি,  বেদুইনটি বলল, ….. হে আল্লাহ ! আমার জীবনের সর্বোত্তম আমল যেন হয় আমার সর্বশেষ কাজটি, এবং জীবনের সর্বোত্তম অংশ যেন আমার জীবনের শেষের অংশটি হয় । 

এরপর তিনি তাঁর জীবনের সেরা দিনটির জন্য দুয়া করেন। তিনি তাঁর কোন দিনটিকে সর্বোৎকৃষ্ট হওয়া পছন্দ করেছেন? তাঁর ডিগ্রি প্রাপ্তির অনুষ্ঠান? স্নাতক সম্পন্নের দিন অথবা তাঁর বিয়ের দিন? বিবাহ উৎসব?

না! যেদিন আমি আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করব ! 

এবং ইয়া আল্লাহ ! আমার জীবনের সর্বোত্তম দিনটি যেন হয় আমার জীবনের সর্বশেষ দিন’।
 হে আল্লাহ ! তোমার সাথে সাক্ষাতের দিনটিকে আমার জীবনের সর্বোত্তম দিন বানিয়ো।

যেদিন আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হবে, সেই দিন, বিচার দিবস। এবং এর মধ্যে অনেক হিকমাহ আছে, কারণ সেই দিনটি ৫০ হাজার বছরের সমান বড়, আর দুনিয়ার সারা জীবন সেই একদিনের তুলনায় একটি টুকরো মুহুর্ত মাত্র। কাজেই, সেই দিনটি যদি ভালো যায়, সব কিছুই ভালো গেল, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন, সেদিন সবকিছু ঠিক ঠাক মত হলে আপনি জিতে গেলেন, আর সেদিন যদি উলটা পালটা যায়, তাহলে আপনার দুনিয়ার জীবন যতই আরামে সুখে কাটুক না কেন, কোন কাজে আসবে না। আপনি কিছুই পেলেন না, সবকিছু হারালেন।

সুতরাং, এই বেদুইন ব্যাপক বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন যখন তিনি বললেন, তোমার সাথে সাক্ষাতের দিনটিকে আমার জীবনের সর্বোত্তম দিন বানিয়ে দিও। আর আমরা যেদিনা আল্লাহর সাক্ষাত পাব সেদিন চূড়ান্ত বিচারের দিন, কেয়ামত দিবসে আল্লাহর সাক্ষাত প্রাপ্ত হবো। আল্লাহর কাছে দোয়া করি যেন সেই দিন তিনি আমাদের উপর সন্তুষ্ট থাকেন। সেই দিন যদি তিনি আমাদের উপর রাজি খুশি থাকেন সেটাই একমাত্র গোনার বিষয়, সেটাই একমাত্র ধর্তব্য বিষয়।

 

কেয়ামত দিবস মূলত দিন হিসেবে অনেক লম্বা হবে এবং সেদিন অনেক ঘটনা ঘটবে। মানুষ সেদিন বিভিন্ন ঘটনাবলীর সম্মুখীন হবে। যাই হোক আমরা সেগুলো পর্যায়ক্রমিকভাবে আলোচনা করব ইনশা আল্লাহ, এই লেকচারগুলো গঠন ও ক্রম, নীল নকশা সাজানো হয়েছে শাইখ উমার আল আশকারের আক্বীদার উপর রচিত চমৎকার কিছু গ্রন্থগুচ্ছের উপর ভিত্তি করে । এটি বিভিন্ন অনুচ্ছেদে ভাগ করা, এবং তিনি একটি অনুচ্ছেদ শুধুমাত্র আখিরাহ-এর জন্য উৎসর্গ করেছেন । 
এই অনুচ্ছেদ আবার আল ক্বিয়ামাহ আস-সুঘরা, 
আল ক্বিয়ামাহ আল কুবরা, আল জান্নাহ ওয়া আন-নার-এ ভাগ করা হয়েছে । 

শায়খ উমার আল আশকার ঐতিহ্যবাহী গ্রন্থসমগ্র, ক্লাসিকাল কিতাব, উম্মাহাতুল কুতুব, সব কিতাবের মা সমতূল্য কিতাবগুলো থেকে খনি থেকে আমাদের জন্য অমূল্য কিছু সম্পদ, মণি মুক্তো বের করে এনেছেন। তিনি শত শত বই থেকে বাছাই করে এর নির্যাসটুকু আমাদের সামনে উপস্থাপন করেছেন।  দুর্ভাগ্যবশত, এই বইটি ইংরেজীতে অনুদিত হয়নি । তবে আমরা তার মূল গ্রন্থের গঠনকেই এই সিরিজে অনুসরণ করব ।

 

তিনি মানুষের বর্তমান অবস্থাকে তিনভাগে বিভক্ত করেনঃ অবিশ্বাসীগণ,মুসলিম যারা পাপী, পাপ জর্জরিত মুসলিম এবং মুত্তাকীন ।

আল কুফফার, ওয়াল ওসা ওয়াল মুত্তাকুন। তিনি মানুষের সেইদিনের অবস্থাকে তিনভাগে বিভক্ত করেনঃ অবিশ্বাসীগণ,মুসলিম যারা পাপী, পাপ জর্জরিত মুসলিম- ভালো মন্দ উভয় মিশে আছে। এবং মুত্তাকীন ।

সেই দিনে অবিশ্বাসীরা 
সেই দিনে অবিশ্বাসীদের তিনি তিন ভাগে ভাগ করেছেন। 

১। আদ-দুল ওয়াল হাওয়ান –  অপমানিত ও অবনতি 
আদ-দুল ওয়াল হাওয়ান মানে হল সেই অপমান ও অবনতি যা শেষ বিচারের দিন যে সত্যকে অস্বীকার করেছে তার উপর বর্তাবে।

 

আল্লাহ্‌ কোরআনে বলছেনঃ সে দিন তারা কবর থেকে দ্রুতবেগে বের হবে, যেন তারা কোন এক লক্ষ্যস্থলের দিকে ছুটে যাচ্ছে। যেন কোন শিকারকে ধাওয়া করছে (৭০:৪৩) প্রকৃতপক্ষে, তারা একটি নির্দিষ্ট জায়গায় দৌড়ে যাচ্ছে না। তারা দৌড়াচ্ছে ঘটনাবলীর জন্য যা সেদিন ঘটছে এবং তাদের অন্তরের ভয়ের জন্য।

আল্লাহ্‌ আরেকটি আয়াতে বর্ণনা করছেন যেমন ওয়া মাআ হুম বি সুকারা’আহ –তারা কেউ মাতাল নয়
 তারা চারিদিকে দৌড়াচ্ছে যেন তারা মাতাল। যেদিন তোমরা তা প্রত্যক্ষ করবে, সেদিন প্রত্যেক স্তন্যধাত্রী তার দুধের শিশুকে বিস্মৃত হবে এবং প্রত্যেক গর্ভবতী তার গর্ভপাত করবে এবং মানুষকে তুমি দেখবে মাতাল; অথচ তারা মাতাল নয় বস্তুতঃ আল্লাহর আযাব সুকঠিন”। (২২:২)

আল্লাহ্‌ বলেন,জালেমরা যা করে, সে সম্পর্কে আল্লাহকে কখনও বেখবর মনে করো না…(১৪:৪২)। আমাদের মধ্যে অনেকেই যখন অত্যাচার ও জুলম দেখি, আমরা বিস্মিত হই, এটা কিভাবে হল এবং আল্লাহ্‌ এটা কিভাবে হতে দিলেন কিন্তু আল্লাহ সুব এই সকল ঘটনা সম্পর্কে অনবহিত নন, গাফেল নন, তিনি সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছেন এবং একটা সময় পর্যন্ত অবকাশ দিয়ে রেখেছেন। 

আল্লাহ্‌ বলে যাচ্ছেনঃ তাদেরকে তো ঐ দিন পর্যন্ত অবকাশ দিয়ে রেখেছেন, যেদিন যালিমদের চক্ষুসমূহ ভয়ে বিস্ফোরিত হবে। তারা মস্তক উপরে তুলে ভীত-বিহবল চিত্তে দৌড়াতে থাকবে। তাদের দিকে তাদের দৃষ্টি ফিরে আসবে না এবং তাদের অন্তর উড়ে যাবে। (১৪:৪২-৪৩) 

দৃশটি কল্পনা করুন, আমার সাথে আপনারাও কল্পনা করুন   মানুষ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে এবং তাদের চোখের পলক পড়ছে না কারণ ওইদিন আপনি এক মুহূর্তের জন্য ও অনবগত, অসচেতন থাকতে সমর্থ হবেনা না। দুনিয়ায় সারাজীবন এই চোখ ঘুমিয়েছিল। 

এটি হচ্ছে সেদিন যখন সবকিছু, সব ঘটনা প্রকাশ করা হবে।

আল্লাহ্‌ আরও বলেছেন যে, -لَا يَرْتَدُّ إِلَيْهِمْ طَرْفُهُمْ ۖ وَأَفْئِدَتُهُمْ هَوَاءٌ – সেদিন অন্তর বাতাসের  মতো হালকা হবে হাওয়া- মানে বাতাস। এবং আরেকটি অর্থ খালি, হালকা। যখন আমরা সাহসী কাউকে বুঝাই, তখন বলি দৃঢ় অন্তর, ভারী অন্তর। এবং ওইদিন যা-ই ঘটবে তা তাদের শরীরে ভয়ের আঘাত করবে।

আরেকটি আয়াতে, আল্লাহ্‌ সুবহান ওয়াতাআলা তাদের অন্তরকে গলার কাছে উঠে আসবে, খাদিমীন হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এত ভয়ের একটি দিন হবে, যেদিন ভয়ে দমবন্ধ হয়ে আসবে আপনি তাদেরকে আসন্ন দিন সম্পর্কে সতর্ক করুন, যখন প্রাণ কন্ঠাগত হবে, দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হবে…(৪০:১৮)

 

যখন আমরা বিচার দিনের কথা বলি, আমরা এই বিষয়ে কথা বলি যেন এটি ভবিষ্যতের কোন কিছু যা অস্পৃশ্য(ধরা ছোঁয়া যায় না)। আল্লাহ্‌ সুবহান ওয়াতাআলা এই সম্পর্কে কথা বলেছেন এবং এটিকে বলেছেন আল-আযিফা [দেখুন ৪০:১৮] । আল-আযিফা এমন কোন কিছু যা ঠিক এখানেই আছে, যেন শেষ বিচারের দিন খুবই সন্নিকট। আল্লাহ্‌ সুবহান ওয়াতাআলা বলেন, আল্লাহর নির্দেশ এসে গেছে। অতএব এর জন্যে তাড়াহুড়া করো না…(১৬:১) 

খুব শিঘ্রই, আমরা সেখানে এক হব, এই সমস্ত জিনিস যা আমরা কাগজে বর্ণনা করছি, সেদিন আমরা তা নিজের চোখ দিয়ে দেখব।

 

কারন, ঠিক এই মুহুর্তে, আপনার জীবনের পিছনের দিকে তাকান আপনার সব স্মৃতিগুলোর দিকে। আপনি যদি সেগুলো একত্রিত করে বর্ণনা করতে শুরু করেন, এটি করতে মাত্র আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা লাগবে। খুব শিঘ্রই আমরা আমাদের বিছানায় শায়িত থাকব, মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হয়ে। এবং এরপরেই চলে আসবে কিয়ামতের দিন, বিচার দিবস। বেশি দিন দূরে নয়। 
আল্লাহ সুব তায়ালাও এই দিনটিকে বলেছেন, আল আ-আযিফা, এমন দিন যা নিকটেই আছ, কামিং সুন, খুব তাড়াতাড়ি চলে আসছে।


সেই দিনে, ইয়াউম আলকিয়ামাহ হল শেষ বিচারের নামের মধ্যে একটি। কিয়ামাহ মানে দাঁড়ানো। মানুষ সেদিন দাড়িয়ে থাকবে।

আল্লাহ্‌র নবী (সাঃ) বলছেনঃ শেষ বিচারের দিন, সূর্য মানুষের এত কাছে আসবে যে এর দূরত্ব এক মাইল হবে। 
সূর্য সৃষ্টিজগতের কাছে নেমে আসবে। আরবিতে যে শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, এর অর্থ দূরত্ব, কিংবা আরও অন্য কিছু হতে পারে। মাইল, সুলাইম ব. আমির বলেছেনঃ আল্লাহ্‌র কসম, আমি জানি না উনি কি মাইল দ্বারা পৃথিবীর মাইল না সে যন্ত্র যা দিয়ে চোখে মাশকারা, সুরমা দেয়া দেওয়া হয়। খুবই অল্প দূরত্ব।  কিন্তু এখানে, মূল বিষয়টি হচ্ছে সূর্য খুব কাছে থাকবে। এবং সহীহ মুসলিমে, 

নবি(সাঃ) বলেছেন)যে, ‘মানুষ তাদের কাজের অনুযায়ী,ঘামতে থাকবে। কারো  হাঁটু পর্যন্ত; কারো  কোমর পর্যন্ত ঘাম থাকবে’।  মানুষ তার আমল অনুসারে ঘামতে থাকবে, যার খারাপ কাজ বেশি হবে তার ঘাম বেশি হবে, কারণ সেদিন মাথার উপর সূর্য থাকবে, কোন ছায়া থাকবে না।  এবং এটি বলার সময় , আল্লাহ্‌র নবী (সাঃ) তাঁর হাত মুখের দিকে নির্দেশ করছিলেন। [মুসলিম, ৪০/৬৮৫২] সৎকর্মকর্মশিলরা আল্লাহ্‌র আরশের ছায়ার নিচে একত্রিত  হবে। মানুষ তাদের কাজ অনুযায়ী সেদিন ঘামবে।

 

এবং আরেকটি দৃশ্য ,যেখানে যালিমদের অবস্থা সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছে, এমনভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, যে আমাদের চোখের সামনে একটি দৃশ্য ভেসে উঠে। এবং কুরআনের অনেক আয়াতই আমাদের এই বিভিন্ন চিত্র সম্পর্কে কল্পনা করতে উদ্ভুদ্ধ করে। আল্লাহ্‌ কুরআনে বিভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছেন, সচিত্র প্রতিবেদন। বিশেষ করে আখিরাত বিষয়ক, আল্লাহ্‌ এর বাস্তবতা বুঝাবার জন্য এসব ছবি ব্যবহার করেছেন। 

আল্লাহ্‌ বলেন, জালেমরা সেদিন নিজদের হাত  কামড়াতে কামড়াতে বলবে, হায় আফসোস! আমি যদি রসূলের সাথে পথ অবলম্বন করতাম।(২৫:২৭) চরম আক্ষেপের সময়, আপনি আপনার আঙ্গুলের উপর কামড়াতে পারেন। আল্লাহ্‌ বলেননি তারা তাদের আঙ্গুল অথবা হাতের উপর কামড়াবে। আল্লাহ্‌ বলেন যে তারা তাদের হাত কামড়াবে; কল্পনা করুন তারা তাদের হাড়সমূহ কামড়াচ্ছে ও চূর্ণ করছে।। কিন্তু তারা সেই ব্যাথা অনুভব করছে না কারন আক্ষেপের ব্যাথা আরও বেশি। যদিও আক্ষেপ মানসিক ব্যাথা, হাত কামড়ানোর শারীরিক ব্যথা আরও কম…এবং আক্ষেপটা কেন? কারণ তাদের একটাই চিন্তা  আমি যদি রাসুলকে অনুসরণ করতাম”।

আল্লাহ্‌ বলেন,যে দিন কেয়ামত সংঘটিত হবে, সেদিন অপরাধীরা হতাশ হয়ে যাবে। (৩০:১২) 
ক্রিমিনাল, দুবৃত্ত, অবিশ্বাসী, কাফিররা।

ইয়ুবলিস মানে হল হাল ছেড়ে দেওয়া। কোন চেষ্টাও করবে না, কোন আপত্তি আলোচনা, তর্ক নাই। কারণ, আপনি কার সাথে তর্ক করবেন এবং কি নিয়ে তর্ক করবেন? সেদিন তারা যাবতীয় চেষ্টা ছেড়ে দেবে ও আশা হারাবে।

আল্লাহ্‌ বলেন, সাতরি সেদিন কামনা করবে সে সমস্ত লোক, যারা কাফের হয়েছিল এবং রসূলের নাফরমানী করেছিল, যেন যমীনের সাথে মিশে যায়… (৪:৪২) 

এখানে রূপক ভাবে এক ব্যাক্তির কথা বলা হচ্ছে যে দুনিয়ার প্রতি আসক্ত ছিল। টাকার বিনময়ে অর্থের জন্য এই দীনকে দূরে ফেলে রেখেছিল, এগুলো নিয়ে মনোযোগী ছিল না। আল্লাহ্‌ আরেক আয়াতে বলেন, যখন কাফেররা বলবে, আমি যদি ধুলা হতে পারতাম!৭৮-৪০

এগুলো এমন সব লোক ছিল, যারা খুবই উচ্চাভিলাষী, দুনিয়াতে অনেক উচ্চ আশা, লক্ষ্য ছিল, আর যেদিন তারা হিসাব নিকাশের দিনটিকে দেখবে সেদিন আর তাদের কোন উচ্চ আশা থাকবে না, তারা সম্পূর্ণরূপে হতাশ হয়ে যাবে, হাল ছেড়ে দেবে, এমনকি চাইবে যদি তারা মাটি হয়ে যেত । এবং এই আয়াত আমাদেরকে বলে, যে আসলে আমরা এই আশা এম্বিশনের দুনিয়াতে আসলে একটা স্বপ্নের ঘোরের মধ্যে বাস করছি।

 

২য় দৃশ্যঃ যখন আমরা কুফফারদের অবস্থা আলোচনা করছি,  ইহবাত উল-‘আমাল:নিষ্ফল কর্ম

ইহবাত উল-‘আমাল হল কর্মের নিষ্ফলতা। আল্লাহ বলেন,  “যারা কাফের, তাদের কর্ম মরুভুমির মরীচিকা সদৃশ, যাকে পিপাসার্ত ব্যক্তি পানি মনে করে”।‘’ মরীচিকা হল আলোক ভ্রম, চোখের ভুল যা মরুভূমি কিংবা গরমের দিনে হাইওয়েতে দেখা যায় যার কারণ হল  বাতাস এবং আর্দ্রতা। আপনি একে ধরতে যাবেন, তা আপনার থেকে দূরে সরে যাবে।আল্লাহ সুবহানা তা’আলা অবিশ্বাসীদের কর্মের তুলনা দিতে এটা ব্যবহার করেছেনঃ সেগুলো হচ্ছে মরুভূমির মরীচিকা স্বরূপ। আয়াতটিতে  আরোও বলা হয়েছে, ‘’ ‘এমনকি, সে যখন তার কাছে যায়, তখন কিছুই পায় না এবং পায় সেখানে আল্লাহকে, অতঃপর আল্লাহ তার হিসাব চুকিয়ে দেন। আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী’। (নূর ৩৯)

 

আল্লাহ সুবহানা তাআলা আরোও বলেন, ‘‘’অথবা (তাদের কর্ম) প্রমত্ত সমুদ্রের বুকে গভীর অন্ধকারের ন্যায়, যাকে উদ্বেলিত করে তরঙ্গের উপর তরঙ্গ, যার উপরে ঘন কালো মেঘ আছে। একের উপর এক অন্ধকার। যখন সে তার হাত বের করে, তখন তাকে একেবারেই দেখতে পায় না। আল্লাহ যাকে জ্যোতি দেন না, তার কোন জ্যোতিই নেই’।‘’ [২৪:৪০]

 কর্মসমূহ অন্ধকারের মতন, যতই তারা তা সম্পাদন করবে,ততই অন্ধকার তাদের ঢেকে ফেলবে এমনকি তারা তাদের সম্মুখে প্রসারিত হাতকেও দেখতে পাবে না। এটা কিয়ামাতের দিন আক্ষরিক অর্থেই ঘটবে, একটা সময় সবকিছু অন্ধকার হয়ে যাবে।  তারা পুল-সিরাতের উপর থাকা অবস্থায় আলো হারিয়ে ফেলবে। আমরা জানি যে, সিরাত অনেক অন্ধকার। বিশ্বাসীদেরই কেবল আলো দেয়া হবে। যারা আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসকে প্রত্যাখ্যান করেছিল, তারা নিকষ কালো আঁধারে নিপতিত হবার দরূন তাদের নিজ হাতকেই তাদের সামনে দেখতে পাবে না।

 

আল্লাহ আরেকটি তুলনা, ২য় তুলনা, উপমা দিয়েছেন যাতে তিনি তাদের খরচ করা অর্থ সম্পর্কে বলেছেন।আল্লাহ বলেন, ‘এ দুনিয়ার জীবনে যা কিছু ব্যয় করা হয়, তার তুলনা হলো ঝড়ো হাওয়ার মতো, যাতে রয়েছে তুষারের শৈত্য, যা সে জাতির শস্যক্ষেত্রে গিয়ে লেগেছে যারা নিজের জন্য মন্দ করেছে। অতঃপর সেগুলোকে নিঃশেষ করে দিয়েছে। বস্তুতঃ আল্লাহ তাদের উপর কোন অন্যায় করেননি, কিন্তু তারা নিজেরাই নিজেদের উপর অত্যাচার করছিল’।( ইমরান১১৭) 

আল্লাহ সুব তায়ালা এখানে কুফফাররা যে অর্থ খরচ করে তার তুলনা দিয়েছেন। তারা বিভিন্ন কাজে প্রচুর অর্থ খরচ করে, বড় একটা পরিমাণ অর্থ তারা খরচ করে ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধে। এবং অতীতেও ইসলামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন যুগে প্রচুর অর্থ খরচ করা হয়েছে, বিলিয়ন বিলিয়ন অর্থ ব্যয় হয়েছে। শুধুমাত্র ইসলামের প্রসার, অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য। আজকের দিনেও বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হচ্ছে ইসলামকে থামিয়ে দেয়ার জন্য। 

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা এখানে এ সম্পর্কে বলছেন, এই অর্থ যা তারা খরচ করেছে, কিংবা করছে, এটার উদাহরণ হল শীতল শৈত্যপ্রবাহের মত, যা যেখানে প্রবাহিত হয়েছে সেখানকার শস্যক্ষেত্রে, ফসলকে ধ্বংস করে দিয়েছে।
অন্য কথায়, ফ্রস্টবাইট, এটা ঠান্ডায় জমে যাওয়া আঘাতের মতন যা ফসলাদি ধ্বংস করে দেয়। কেউ একজন একটা গাছ রোপণ করল, এরপর তারা গাছকে পরম যত্নে বড় করে তোলে এবং যখন গাছে ফল আসার সময়, যখন তার এত পরিশ্রমের ফসল ভোগ করার সময়  আসে আর তারা এটার জন্যে অধীর আগ্রহে থাকে, দেখা যায়, তারা সেটার কিছুই পায় না! বরফের মত ঠাণ্ডা শৈত্য প্রবাহে সবকিছু নষ্ট হয়ে যায়। এটাই হচ্ছে উদাহরণ, কুফফাররা যে সমস্ত অর্থ ব্যয় করে সেটা বোঝানোর জন্য।

এই অর্থ বর্তমানে যা তারা খরচ করে চলেছে, তাদের কোন পার্থিব স্বার্থ হাসিলের জন্যই হচ্ছে কিন্তু বিচার দিবসে এটা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়ে যাবে।

 

আমরা যখন তাদের কাজের নিষ্ফলতা নিয়ে এই আয়াতের অবতারণা করি, আমরা অবাক হয়ে বলে উঠতে পারি, ‘’আল্লাহ কি ইনসাফকারী নন?’’ তিনি কি মানুষকে কর্মফল অনুযায়ী পুরষ্কৃত করতে পারতেন না? 

এটাকে সহজ করে বোঝাবার জন্যে আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ তাদের প্রতি যুলুম করার ছিলেন না; কিন্তু তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি যুলুম করেছে’। [২৯: ৪০]  আপনাকে আল্লাহর কাছে আপনার কর্মের কারণে জবাবদিহি করতে হবে, অন্যদের জন্য নয়, তারা নিজেরাই নিজদের উপর যুলুম করেছে, আল্লাহ তাদের প্রতি যুলুম করেননি।

 

তাদের এই নিস্ফল কাজের  ৩য় তুলনা দেয়া হয়েছে এভাবেঃ
‘যারা স্বীয় পালনকর্তার সত্তার অবিশ্বাসী তাদের অবস্থা এই যে, তাদের কর্মসমূহ ছাইভস্মের মত যার উপর দিয়ে প্রবল বাতাস বয়ে যায় ধূলিঝড়ের দিন। তাদের উপার্জনের কোন অংশই তাদের করতলগত হবে না। এটাই দুরবর্তী পথভ্রষ্টতা’। [১৪:১৮]

ভেবে দেখুন, ছাই ভস্মের পর্বতটি হল আপনার কর্ম। এটা আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে অনেক, একটা পর্বত সমান। আপনি অনেক কাজ সম্পন্ন করে ফেলেছেন।আপনি আপনার কর্মের প্রতিফল গ্রহণ করতে যাচ্ছেন, কিন্তু একটা ঝড় এসে সব কর্মকে উড়িয়ে নিয়ে গেলো।আপনি তা ধরবার চেষ্টা করবেন-কিন্তু আপনি কি ধরতে পারবেন? তারা তো ছাইভস্ম। যে সকল কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে করা হয় না, তার কোন মূল্যই নেই। 

চেয়ে দেখুন, কুর’আনে কি সুন্দরভাবে বিষয়টিকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ! অসাধারণ একটি চিত্র,  ছাইভস্মর পরিমাণ অনেক, কিন্তু এটা কিছুই না দুইটা  যেকোন একটা কারণেঃ

১) হয় কাজটি ইখলাস বিবর্জিত

২)এবং তা ইত্তিবাহ  (রাসূল সা. এর সুন্নাহ অনুসারে করা) ছাড়া হয়েছে।

কোন কাজ কবুল হওয়ার জন্যে তাকে দুইটি শর্ত পূরণ করতে হবে:

১) ইখলাস: সততার সাথে একমাত্র আল্লাহর জন্যে তা করা। ন্যায়বিচার মতে, আপনি আল্লাহর কাছে কাজের প্রতিদান আশা করতে পারেন না। যদি আপনি তা আল্লাহর জন্যে নাই করেন, তাহলে কিভাবে আপনি আশা করতে চান আল্লাহ এর জন্যে আপনাকে পুরষ্কৃত করবেন?  ঠিক এই ঘটনাই ঘটবে বিচার দিবসে।আল্লাহ সুবহান ওয়া তা’আলা মানুষকে বলবেন, যারা অন্য কোনো ইলাহর ইবাদত করত, যাও! তোমাদের ইলাহের কাছে এবং তাদেরকে প্রতিদান দিতে বল; 
যারা মানুষের ইবাদত করতে, যাও! সেসব মানুষের কাছে এবং তাদেরকে প্রতিদান দিতে বল । 
যারা মালাইকা/ফেরেশতার ইবাদাত করতে, যাও! মালাইকার কাছে এবং তাদেরকে প্রতিদান দিতে বল।
যারা একমাত্র আমারই ইবাদত করতে,আজ আমি তোমাদের পুরষ্কৃত করবো।

 

)আলইত্তিবাহ: কাজটি সঠিক পদ্ধতিতে করতে হবে। আপনি নিজের ইচ্ছানুযায়ী আল্লাহ সুবহান ওয়া তা’আলা ’র ইবাদাত করার জন্যে নিয়ম চালু করতে পারেন না। আল্লাহ যেভাবে পছন্দ করেন সেই নিয়মেই করতে হবে কেননা আল্লাহ আপনার থেকে বেশি জানেন। অতএব, আল্লাহর জন্যেই তা ছেড়ে দিন।

আল্লাহ আরেকটি রূপকের অবতারণা করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি তাদের কৃতকর্মের প্রতি মনোনিবেশ করব, অতঃপর সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধুলিকণারূপে করে দেব’।[২৫:২৩]

আল্লাহ বলেছেন তিনি তাদের কর্মকে হাবা’আ ’য় পরিণত করবেন। হাবা আল মানসুরাহ, হাবা’আ কি? আলী বিন আবু তালিব আমাদের হাবা’আ এর বর্ণনা দিয়েছেন। আপনি যদি অন্ধকার অথবা হালকা অন্ধকার ঘরে থাকেন এবং জানালা দিয়ে অল্প আলো আসতে থাকে, আপনি ক্ষুদ্র কিছু আলোক কণা দেখতে পাবেন। বাতাসে ভেসে থাকা ধূলোবালি , হাবা’আ হল সেসব ক্ষুদ্র আলোক কণা। তারা বাতাসে বিদ্যমান, কিন্তু তাদেরকে আপনি বিশেষভাবে দেখতে পাবেন অন্ধকার ঘরে থাকাকালীন এবং কিছু আলো ও আসবে সাথে।

আল্লাহ তা’আলা বলেন, বলুনঃ ‘আমি কি তোমাদেরকে সেসব লোকের সংবাদ দেব, যারা কর্মের দিক দিয়ে খুবই ক্ষতিগ্রস্ত’।

লাভ ক্ষতি দেখে আমরা অনেক কাজ করি। কিন্ত লাভ, ক্ষতি ইত্যাদির ইসলামে একটা সুস্পষ্ট ধারণা আছে। আমাদের চিন্তাধারণা এবং বুঝকে সেই ইসলামিক ধারণাতেই মিলিয়ে দেখা উচিত, কেননা মাঝে মাঝে আমরা মনে করি সুখ হল ভিন্নরকম একটা জিনিস,। উদাহরণস্বরূপ, যদি আপনি ক্ষতির কথা চিন্তা করেন আপনি ব্যবসার ক্ষতির কথা চিন্তা করতে পারেন, কিন্তু এটা ‘ক্ষতি’র ইসলামিক সংজ্ঞা নয়।

আল্লাহ বলছেন, ‘তারাই সে লোক, যাদের প্রচেষ্টা পার্থিবজীবনে বিভ্রান্ত হয়, অথচ তারা মনে করে যে, তারা সৎকর্ম করেছে। তারাই সে লোক, যারা তাদের পালনকর্তার নিদর্শনাবলী এবং তাঁর সাথে সাক্ষাতের বিষয় অস্বীকার করে। ফলে তাদের কর্ম নিষ্ফল হয়ে যায়। সুতরাং কেয়ামতের দিন তাদের জন্য আমি কোন গুরুত্ব স্থির করব না। জাহান্নাম-এটাই তাদের প্রতিফল; কারণ, তারা কাফের হয়েছে এবং আমার নিদর্শনাবলী ও রসূলগণকে বিদ্রূপের বিষয় রূপে গ্রহণ করেছে।[১৮:১০৩-১০৬]

 

তৃতীয় অবস্থাআলতাখাসাঃ তর্কবিতর্ক মতানৈক্য

শাইখ একে চার ভাগে বিভক্ত করেছেনঃ

১) উপাস্য এবং উপাসক – আল ইবাদ ওয়াল মাবুদিন

২) অনুসারী এবং যার অনুসরণ করা হয়

) ইনসান ওয়া কারিন

)একজন ব্যক্তি নিজে তার নিজের দেহ

আমরা প্রথম ক্যাটাগরি, 
ঐসব তর্ক-বিতর্ক নিয়ে কথা বলব যা মুর্তি ও এর উপাসক, মালাইকা ও তাদের উপাসক, এবং ঈসা (আঃ) এবং তাঁর উপাসকদের মধ্যে ঘটে থাকে।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মুর্তি উপাসনা-আল আসনাম সম্পর্কে বলেনঃ “যেদিন আমি তাদের সবাইকে আমার সামনে একত্রিত করবো, অতঃপর যারা আমার সাথে শরীক করেছে তাদের আমি বলবো, তোমরা এবং যাদের তোমরা শরীক করেছো স্ব স্ব স্থানে অবস্থান করো, এরপর আমি তাদের (এক দলকে আরেক দল থেকে) আলাদা করে দেবো এবং যাদের তারা শরীক করেছিলো তারা বলবে, না, তোমরা তো কখনো আমাদের উপাসনা করতে না।” আয়াতটিতে যার ইবাদত করা হয় অথবা ‘শরীক’ এর দুটি ব্যাখ্যা আছে। কারো মতে, এগুলো হলো মুর্তিসমূহ; অন্য ব্যাখ্যায় আছে এগুলো হলো শায়াতীন। তারা সরাসরি এর প্রত্যাখ্যান করবে। 

পরবর্তী আয়াতে বলা হয়, “আল্লাহ তা’আলাই আমাদের এবং তোমাদের মাঝে সাক্ষ্য প্রদানকারী হিসেবে যথেষ্ট, আমরা তোমাদের উপাসনার ব্যাপারে (আসলেই) গাফেল ছিলাম।” এই মূর্তিগুলো  -এগুলো হলো পাথরের টুকরো। তারা জানতো না কি চলছিল, এটা আসলেই এমন একটা বিষয় যা এমন কাউকে হতাশ করবে যে তার পুরো জীবন এই মূর্তিসমূহের উপাসনায় অতিবাহিত করেছে। সারাজীবন ধরে আপনি একটা কিছু জড় বস্তুর উপাসনা করলেন, সেই ভয়ানক দিনে আপনি বলবেন, হে প্রভূ আমাকে বাঁচাও- কিন্ত চরম হতাশার বিষয় একদিন আপনি দেখতে পাবেন, এতদিন যার ইবাদত করেছেন, সে নিজেও এটা জানে না ! এর থেকে হতাশার আর কি হতে পারে!

 

এবং এরপর, আল্লাহর কিছু সৃষ্টিসমূহ  যাদের উপাসনা  করা হয়েছিল তাদের বিনা অনুমতিতে, যদিও তারা এটা কামনাও করতো না।  তারা নিজেরাও সেটা চাইতো না। যেমন, মালাইকারা কখনোই উপাসিত হতে কামনা করেনি। কিন্তু আরব ও অন্যান্য স্থানের কিছু মুশরিক তাঁদের ‘ইবাদাত করতো। “যেদিন তিনি এদের সকলকে (হাশরের ময়দানে) একত্রিত করবেন, অতঃপর মালাইকাদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলবেন, এ (মানুষ)-রা কি (দুনিয়াতে) শুধু তোমাদেরই ‘ইবাদাত করতো?”যেদিন তিনি তাদের সবাইকে একত্রিত করবেন এবং ফেরেশতাদেরকে বলবেন, এরা কি তোমাদেরই পূজা করত? ৩৪-৪০ 

আল্লাহ তা’আলা মালাইকাদের উপস্থিত করবেন এবং মালাইকাদের জিজ্ঞাসা করবেন, এই মানুষেরা কি তোমাদেরই ‘ইবাদাত করতো? 

আল্লাহ তা’আলা কি এর উত্তর জানেন? হ্যাঁ। তবে জিজ্ঞাসা করার উদ্দেশ্য কি? আল্লাহ মালাইকাদের ঐ মানুষদের সামনে জিজ্ঞাসা করছেন যারা মালাইকাদের উপাসনা করতো যাতে মানুষেরা মালাইকাদের মুখ থেকে জবাব শুনতে পারে; এটাই হচ্ছে সাক্ষ্য। তাঁরা বলবেঃ 

আপনি সুমহান! তাদের পরিবর্তে আপনিই আমাদের ওয়ালি। কখনোই নয়, তারা জ্বীনদের উপাসনা করতো, এবং এদের অধিকাংশই তাদের বিশ্বাসী ছিলো।’ 

ফেরেশতারা বলবে, আপনি পবিত্র, আমরা আপনার পক্ষে, তাদের পক্ষে নই, বরং তারা জিনদের পূজা করত। তাদের অধিকাংশই শয়তানে বিশ্বাসী। ৩৪-৪১
 
মালাইকারা বলবেন, সুবহানাক – যার অর্থ তানযি আল-হাক্ব। যখন আমরা বলি,  সুবহানাল্লাহ- এই শব্দটি বলতে এটাই বুঝায় যে আপনি আল্লাহর ক্ষেত্রে যেকোন ধরনের দূর্বলতা ও খারাপ গুনাবলীর প্রত্যাখ্যান করছেন এবং আপনি আল্লাহর প্রত্যেক সুগুনাবলীকে আল্লাহর জন্যে নির্দিষ্ট করছেন। 
অনেক গুজব আছে যাতে লোকেরা দাবী করে যে তারা মালাইকাকে দেখেছে, কথা বলেছে অথবা স্বপ্নের মধ্যে একজনকে দেখছে – এগুলো সবই হলো জ্বীনের সাথে সাক্ষাত।

 

যুগে যুগে এরকম অনেক মানুষ আছে,  আল্লাহর পরিবর্তে যাদের উপাসনা করা হয়, কিন্তু মানুষের মধ্যে যার আরাধনা সবচেয়ে বেশি হয়েছে তিনি হলেন ‘ঈসা। ‘ঈসা (আঃ) এর উপাসনায় পৃথিবীতে অস্তিত্বশীল শিরকের সব থেকে ভয়ানক পন্থাসমূহের মাধ্যমে শিরক করা হতো। এজন্যেই, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এই আয়াতগুলোতে ‘ঈসা (আঃ) এর উপাসনার প্রতি আলোকপাত করেছেন। যদিও আরো অনেকেই উপাসিত হয়েছিল, আল্লাহ তা’আলা নির্দিষ্টভাবে তাদের নাম উল্লেখ করেননি, কিন্তু আল্লাহ তা’আলা নির্দিষ্টভাবে ‘ঈসা ইবনে মারইয়ামের উল্লেখ করেছেন। ‘ঈসা (আঃ) এর নামে আরো অনেক ইলাহ-এর শরীক করা হয়, যদি ‘ঈসা (আঃ)-এর এসবের সাথে বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই।

 

আল্লাহ তা’আলা বলেন, “যখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, হে মারইয়াম পুত্র ‘ঈসা! তুমি কি কখনো (তোমার) লোকদের (একথা) বলেছিলে যে, তোমরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে আমাকে ও আমার মাকে ‘ইলাহ’ বানিয়ে নাও! (এ কথার উত্তরে) তিনি বলবেন (হে আল্লাহ), সমগ্র পবিত্রতা তোমার জন্যে, এমন কোন কথা আমার পক্ষে শোভা পেতো না, যে কথা বলার আমার কোনো অধিকারই ছিলো না, যদি আমি তাদের এমন কোনো কথা বলতামই, তাহলে তুমি তো অবশ্যই তা জানতে; নিশ্চই তুমি তো জানো আমার মনে যা কিছু আছে, কিন্তু আমি তো জানিনা তোমার মনে কি আছে; যাবতীয় গায়েব অবশ্যই তুমি ভালো করে অবগত আছো।” (মায়েদা ১১৬)

এখানে, আল্লাহ তা’আলা কথা বলছেন মুহাম্মাদ (সাঃ) এবং প্রত্যেক ঐ ব্যক্তির সাথে যখন সে কোর’আন তিলাওয়াত করে. যখন তিনি (আল্লাহ) বলেন, “এবং স্মরণ করো।” কিভাবে আল্লাহ তা’আলা স্মরণ করতে বলেন যখন আল্লাহ তা’আলা ‘ঈসা (আঃ)-কে শেষ বিচারের দিনে জিজ্ঞেস করবেন? মুফাসসিরীনদের একজন বলেন যে, মানুষের জ্ঞানানুযায়ী সময় তিন ভাগে বিভক্তঃ অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যত। মানুষ হিসেবে ভবিষ্যতের কোনকিছুর উপর আমাদের কোন নিয়ন্ত্রন নেই। সুতরাং, আমরা ভবিষ্যত সম্পর্কে জানিনা। যদি আপনি এখন উঠে দাড়ানোর এবং এই কক্ষ থেকে বেরিয়ে যাবার নিয়্যাত করেন তবে এর পরিণতির উপর আপনার কোন নিয়ন্ত্রন নেই। আমরা এ ব্যাপারে পরিকল্পনা করতে পারি কিন্তু আমরা একে নিয়ন্ত্রন করি না। 

আল্লাহর জন্যে অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যত সবই সমান। তিনি সর্বজ্ঞ; তিনি আমাদেরকে ও আমাদের কাজ-কর্মকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তা’আলা ভবিষ্যত সম্পর্কে জ্ঞাত এবং তিনি এ সম্পর্কে এমনভাবে বলতে কথা পারেন যেন তা অতীত। এখানে মারিয়ামের (আঃ) উল্লেখও করা হয়েছে, যদিও প্রত্যক্ষভাবে তাঁর উপাসনা করা হতো না, তাকে ‘ঈশ্বরমাতা’ বলে ডাকা হতো, যা ছিলো তাকে দেওয়া একটি স্বর্গীয় বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ তা’আলা বলেন যে তারা যেনো তাঁর ‘ইবাদাত করছিলো। আল্লাহ তা’আলা যখন ঈসা (আঃ)-কে জিজ্ঞেস করছিলেন যে, তিনি মানুষকে তাঁর ইবাদাত করতে বলেছিলেন কিনা এর জবাবে ঈসা (আঃ) বলা প্রথম কথাগুলো কি ছিলো? সুবহানাল্লাহ… সুবহানাকা! 

আবারো, যদি আল্লাহ তা’আলা উত্তর জেনেই থাকেন তাহলে কেনো তিনি ঈসা (আঃ)-কে জিজ্ঞেস করছেন? তিনি ঈসাকে (আঃ) জিজ্ঞেস করছেন যাতে তিনি মানুষের সম্মুখে তা বলতে পারেন।

 

আর তিনি মানুষের সামনে কি বলবেন?

“তুমি আমাকে যা কিছু বলতে হুকুম করেছো আমি তো তাদের তা ছাড়া (অন্য) কিছুই বলিনি, (আর সে কথা ছিলো), তোমরা শুধু আল্লাহ তা’আলার ‘ইবাদাত করো, যিনি আমার মালিক, তোমাদেরও মালিক, আমি যতোদিন তাদের মধ্যে ছিলাম ততোদিন তো আমি (নিজেই তাদের কার্যকলাপের) সাক্ষী ছিলাম, কিন্তু যখন তুমি আমাকে তুলে নিলে তখন তুমিই ছিলে তাদের উপর একক দ্রষ্টা, যাবতীয় ক্রিয়াকর্মের তুমিই ছিলে একক খবরদার। (আজ) তাদের অপরাধের জন্যে তুমি যদি তাদের শাস্তি দাও (দিতে পারো), কারণ তারা তো তোমারই বান্দা, আর তুমি যদি তাদের ক্ষমা করে দাও (তাও তোমার মর্জি), অবশ্যই তুমি হচ্ছো বিপুল ক্ষমতাশালী, প্রজ্ঞাময়।” (সুরাহ মা’ইদাহঃ ১১৭-১১৮)

 ঈসা (আঃ) সবার সম্মুখে এটা ঘোষণা করছেন। এবং তিনি বলছেন যে, এই দিন বিচারের মালিক একমাত্র আল্লাহ, আমি নই।  “আল্লাহ তা’আলা বলবেনঃ এ হচ্ছে সেদিন, যেদিন সত্যাশ্রয়ী ব্যক্তিরা তাদের সততার জন্যে (প্রচুর) কল্যাণ লাভ করবে; (আর সে কল্যাণ হচ্ছে,) তাদের জন্যে এমন সুরম্য জান্নাত, যার তলদেশ দিয়ে অমীয় ঝর্ণাধারা প্রবাহিত থাকবে, সেখানে তারা চিরদিন থাকবে; আল্লাহ তা’আলা তাদের উপর সন্তুষ্ট থাকবেন এবং তারাও আল্লাহ উপর সন্তুষ্ট থাকবে; (বস্তুত) এ হচ্ছে এক মহাসাফল্য। (সুরাহ মা’ইদাহঃ ১১৯)




, অনুসারী এবং যার অনুসরণ করা হয়

আল্লাহ তা’আলা বলেন “(মহাবিচারের দিন) তারা সবাই আল্লাহর সামনে উপস্থিত হবে, অতঃপর যারা দুনিয়ায় দুর্বল ছিলো (তাদের উদ্দেশ্য করে)- যারা অহংকার করতো, বলবে, (দুনিয়ায়) আমরা তো তোমাদের অনুসারীই ছিলাম, (আজ কি) তোমরা আল্লাহর আযাব থেকে সামান্য কিছু হলেও আমাদের জন্যে কম করতে পারবে? তারা বলবে, আল্লাহ তা’আলা যদি আমাদের (আজ নাজাতের) কোনো পথ দেখিয়ে দিতেন, তাহলে আমরা তোমাদেরও (তা) দেখিয়ে দিতাম, (মুলত) আজ আমরা ধৈর্য ধরি কিংবা ধৈর্যহারা হই, উভয়টাই আমাদের জন্যে সমান কথা, (আল্লাহর আযাব থেকে আজ) আমাদের কোনোই নিষ্কৃতি নেই। (১৪ঃ২১) 

একজন বিখ্যাত ‘আলীম এই আয়াত সম্পর্কে গভীর কিছু কথা বলেছেন; তাঁর দেওয়া আয়াতগুলোর তাফসির এরকমঃ তিনি বলেন যে, দূর্বল হচ্ছে তারাই যারা মানুষের জন্যে নির্দিষ্ট, মানুষের জন্য নির্ধারিত একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য পরিত্যাগ করে,অথচ এটা মানুষ-জিন বাদে অন্য কাউকে দেয়া হয়নি, এবং এটা হচ্ছে চিন্তা ও বিশ্বাসের ব্যক্তি স্বাধীনতা, 

মানুষের  বা ইনসানের জন্যে নির্দিষ্ট বিশেষ গুণটি কি? আল্লাহ তা’আলা মানুষের নির্বাচন করার গুণটি দিয়েছেন। এই মহাবিশ্বের প্রত্যেকটা জিনিষ তাসলিম বা আত্মসমর্পণের রুপে আল্লাহ তা’আলার ‘ইবাদাত করছে। সবকিছুই অধীনস্ত  – সূর্যের গতিবিধি, তারা, গ্রহসমূহ, চাঁদ, গাছগাছালি – সবকিছুই আল্লাহ তা’আলার ‘ইবাদাত করছে এবং তাদের গতিবিধিই হচ্ছে ইবাদাত।

মানুষ এবং জ্বীনই একমাত্র সৃষ্টি যার বিশ্বাস করার বা না করার স্বাধীনতা আছে। কাফির শুধুমাত্র জ্বীন এবং ইনসানের মধ্যেই আছে। আমাদেরকে আল্লাহ তা’আলার দেয়া অনন্য একটি গুণ হচ্ছে চিন্তার স্বাধীনতা।

এই ‘আলীম বলছেন যে ঐ লোকেরা দূর্বল হয়ে গেছে কারণ তারা নির্বাচন করার স্বাধীনতাকে পরিত্যাগ করেছে, যা আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে দিয়েছেন। তিনি (ঐ ‘আলীম) বলছেনঃ এই দুর্বলতা তাদের জন্যে কোন অজুহাত নয়; বরং এটা একটা অপরাধ। কারণ আল্লাহ তা’আলা এটা ইচ্ছা করেন না যে কেউ দুর্বল হোক। তারা তাদের দুর্বলতাকে আল্লাহর সামনে অজুহাত হিসেবে পেশ করতে পারবে না।

কাজেই 
আল্লাহ তা’আলা সেসকল গুণাবলী যাচাই বাছাইয়ের ক্ষমতা দিয়ে আমাদের সজ্জিত করেছেন যেগুলোর সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা হিদায়াত পেতে পারি।

আল্লাহ এই আয়াতে বলেছেন, “এবং আল্লাহ তোমাদের মায়ের গর্ভ থেকে বের করেছেন যখন তোমরা কিছুই জানতে না।” (১৬ঃ৭৮) তোমরা কিছুই জানতে না! এবং আজ তোমরা যে পর্যায়ে পৌছেছো তা কিভাবে সম্ভব হল। চলমান আয়াতে বলা হয়েছে, “এবং তিনি তোমাদের শোনার, দেখার ক্ষমতা ও হৃদয় দিয়েছেন যেন তোমরা কৃতজ্ঞ হও (আল্লাহর প্রতি)” আমাদের চোখ এবং কান তথ্য জোগাড় করে এবং তার সম্মিলন ঘটায়। কিভাবে আমরা শিখি? শোনা,পড়া এবং দেখার মাধ্যমে। এবং যেভাবে একজন শিশুও শেখে। আমরা অন্য ইন্দ্রিয়ের সাহায্যেও শিখি; কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে অধিকাংশ জ্ঞান আমরা লাভ করি চোখ ও কানের মাধ্যমে। এরপর মন তাকে সম্মিলিত করে। 

অতঃপর আল্লাহ বলেন কেন তিনি আমাদের এ জিনিসগুলো দিয়েছেন, যাতে আমরা কৃতজ্ঞ হই। আল্লাহ আমাদের জ্ঞান অর্জনের বাহনগুলো দিয়েছেন যেন আমরা তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হই এবং তাঁর ইবাদাত করি। দূর্ভাগ্যজনকভাবে মানুষ এই 
মাধ্যমগুলোকে ব্যবহার করে দুনিয়ার সবকিছুর জন্য এবং আখিরাত সম্পর্কিত কোন কিছুই শিখে না।

আজকের মানব সভ্যতার সাথে ১০০ বা ১০০০ বছরের পূর্বের তুলনা করুন। প্রযুক্তির অনেক অগ্রগতি হয়েছে চিন্তাশক্তির ব্যবহারের মাধ্যমেই। কিন্তু যখন আখিরাতের কথা আসে, তখন আমরা মনকে নিষ্ক্রিয় করে দেই। এই দূর্বলতা বিচার দিবসের জন্য কোন অজুহাত নয়; এটি একটি অন্যায় কাজ! 

একজন ‘আলীম বলেছেন, “আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা চান না যেন কেউ তার স্বাধীনতা , বস্তুগত শক্তি ও সামর্থ্যকে ছেড়ে দিক। এগুলো- বস্তুগত শক্তি ও সামর্থ্য, 
যতই শক্তিশালী হোক না কেন এটি একজন স্বাধীনতাকামী মানুষকে বন্দি করতে পারে না 
এই পৃথিবীর ক্ষমতা শুধু দেহকে কষ্ট দিতে পারে ব্যাথার মাধ্যমে 
কিন্তু মন তো মুক্ত। 
কেউ তাকে দাসে পরিণত করতে পারে না।” 

তোমার চারপাশের পৃথিবী তোমাকে বন্দি করতে পারে, অত্যাচার-নির্যাতন-নিপীড়ন করতে পারে কিন্তু যদি তোমার কোন মুক্ত মন থাকে তাকে কেউ বন্দি করতে পারে, 
যদি না কাউকে তুমি সে সুযোগ দাও।


কে সেই দুর্বল লোকদের উদ্ধত ও শক্তিশালী লোকদের অনুসরণ করতে বাধ্য করতে পারে যখন তাদের একমাত্র আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন, টিকিয়ে রেখেছেন এবং সাহায্য করেছেন। কিছু দুর্বল আত্মা ব্যতিত/দূর্বল ঈমান বিশিষ্ট ব্যক্তি ছাড়া কেউ এ কাজ করতে পারেনা  । কেউ একজন ব্যক্তিকে মিথ্যার অনুসারী বানাতে পারে না যদি না তারা দুর্বল আত্মার অধিকারী হয়।”

তারপর তিনি বলেন, “তারা একারণে দুর্বল নয় যে শক্তিশালীদের তুলনায় তাদের ক্ষমতা কম।
বরং তারা দুর্বল কারণ তারা দুর্বল হতে চায়। 
তারা দুর্বল কারণ তাদের দুর্বলতা তাদের মন ও আত্মায়। 

দুর্বল লোকদের সংখ্যা কত? অজস্র! এবং অত্যাচারী লোকদের সংখ্যা কত? খুবই অল্প! 
কে এই অত্যাচারী লোকদের দুর্বল লোকদের উপর ক্ষমতা প্রদান করেছে? 

অত্যাচারীরা এই বিপুল জনগনকে দাস বানাতে পারে না যতক্ষন না জনগন এই দাসত্বকে গ্রহন করে। 
এটা দুর্বল ইচ্ছাশক্তি যা তাদের দল থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে (বক্তা সংযোজন করেছেন যেন তারা ভেড়ার মত) ”

এবং কাফিররা বলে মুমিনদের, ‘আমাদের রাস্তা অনুসরণ কর; আমরা তোমাদের পাপসমূহ বহন করবো। কখনই নয় বরং তারা তাদের পাপের বোঝা ছাড়া আর কিছুই বহন করবে না। নিশ্চয়ই তারা মিথ্যাবাদী।” (২৯ঃ১২)

অবিশ্বাসীরা মুহাম্মাদ (সাঃ) এর অনুসারীদের এই রকমই বলতো। এবং আজকের বিশ্বে একই ঘটনা ঘটছে। নেতারা বলে- “আমাদের অনুসরণ কর, আমরা তোমাদের রক্ষা করবো” অনেক ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা আছে যারা সবসময় সত্য ও রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেয়। বিচার দিবসে কি ঘটবে? তারা কারো পাপের বোঝা বহন করবে না। আল্লাহ বলেন, “এবং অবশ্যই তারা তাদের বোঝা বহন করবে এবং অন্যদেরও এবং তাদের বিচার দিবসে প্রশ্ন করা হবে সেই সম্পর্কে যা তারা যা সম্পর্কে মিথ্যা বলত।” (২৯ঃ১৩)

বুখারী শরীফের হাদীসে রাসূল (সাঃ) বলেছেন,  “যে লোকদের একটি ভালো কাজের দিকে ডাকে সে কিয়ামত পর্যন্ত সেই ভাল কাজের পুরস্কারের অংশীদার হবে ঠিক একই রকমভাবে সেই লোকের যে কাজটি করে। এবং যে লোকদের খারাপ কাজের দিকে ডাকে সেও শাস্তির অংশীদার হবে সেই লোকটির মত যে খারাপ কাজটি করে। আপনি যদি কোন লোককে সত্যের দিকে পথনির্দেশ করেন আপনি সেই লোকের সমান পুরস্কার পাবেন এবং তার কোন পুরস্কার হ্রাস পাবে না। 

একইভাবে যদি সেই লোক আরও ৫ জনের কাছে এই সত্যকে পৌঁছায় তবে আপনিও তাদের সকলের সমান পুরস্কারের অধিকারী হবেন এবং এটা চলতে থাকবেই। আপনি এভাবে লাভের অংশীদার হবেন অন্যদের লাভকে হ্রাস করা ছাড়াই। এবং এটা আল্লাহর মহানুভবতা ও উদারতা। এবং অন্যদিকে আপনি যদি মানুষকে মিথ্যার দিকে ডাকেন। তবে আপনিও শাস্তির অধিকারী হবেন এবং কিয়ামত পর্যন্ত যতলোক সেই খারাপ কাজ করবে সকলের পাপের শাস্তির ভাগীদার হবেন। 

আল্লাহ বলেন, “…যদি তুমি দেখতে পেতে, যখন যালিমদের তাদের মালিকের সামনে দাঁড় করানো হবে, তখন তারা একজন আরেকজনের উপর(কথা) চাপাতে থাকবে, যাদের পদাবনত করে রাখা হয়েছিল তারা (এ) প্রাধান্য বিস্তারকারীদের বলবে, যদি তোমরা (সেদিন) না থাকতে তাহলে অবশ্যই আমরা মুমিন থাকতাম।” (৩৪ঃ৩১)

আল্লাহ বিচার দিবসে নেতা ও অনুসারীদের একত্রিত করবেন এবং এটা তাদের মধ্যে কথোপকথন। কারা সেই নেতা? তারা হয়তো ধর্মীয় নেতা, অথবা মিডিয়া অথবা অন্য যে কেউ।এ আয়াতের পরবর্তীতে বর্ণিত হয়েছে, “আর অহংকারী লোকেরা – যাদের দাবিয়ে রাখা হয়েছিলো তাদের বলবে আমরা কি তোমাদের হেদায়াতের পথে না চলার জন্যে তোমাদের বাধ্য করেছিলাম? (বিশেষ করে) যখন হেদায়াত তোমাদের কাছে পৌছে গিয়েছিল (আসলে) তোমরা
নিজেরাই ছিলে নাফরমান (পাপী, বহুঈশ্বর বিশ্বাসী, অপরাধী, অমান্যকারী আল্লাহর আদেশের ইত্যাদি)”- (৩৪ঃ২২) 

অধিকাংশ সময়ই, যারা সত্যকে অনুসন্ধান করতে চায় তারা সত্যের পথে ফিরে আসে।